মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ০৯, ২০০৮

যে দিন চলে যায়

ভালো আছি?
পাতা ঝরে গেছে সব। স্কুলের রাস্তাগুলো ঝরা পাতায় জমাট হয়ে থাকে। ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়, মাঝেমাঝে বৃষ্টিও। ঠান্ডা বৃষ্টি নেমে আসে রাত ভর। ব্যস্ত একেকটা দিনশেষে প্রায় মাঝরাতে যখন ১২ বর্গমিটারের ছোট্ট আবাসে ফিরে আসার জন্যে সাইকেলে প্যাডেল ঘুরাই, তখন সকালে কীভাবে দিনটা শুরু করেছিলাম, সেটা আর মনে থাকে না। মনে করার মতোন শক্তি পাই না আসলে। বাসায় ফিরে আর একটা দৌড় দিয়ে আসার মতো পর্যাপ্ত সময় পাই না। যেদিন সময় পাই, সেদিন দেখা যায় বৃষ্টিতে আর দৌড়ুতে বেরুতে পারি না।

গত মাসে একটা সিম্পোজিয়াম এর জন্যে প্রসিডিংস পেপার লিখতে হচ্ছিলো, লিখি আর চুল ছিড়ি। চুল কে অবশ্য নিরুপায় হয়ে এমনিতেই বিদায় জানাতে হয় এইরকম স্ট্রেস এর সময়গুলোতে। তাছাড়াও আরো অনেক ঝামেলার সাথে জড়িয়ে পড়ায় ইদানিং, অনেকগুলো কাজ একই দিনে পড়ে যায়, ঠিকঠাক সব করে উঠতে পারি না। সময় বন্টন ঠিকমতো করতে পারি না। সেইসব মিলিয়ে একরকম দৌড়ের উপরে থাকি সবসময়। গত সেমিস্টারে একটা কোর্স নিয়েছিলাম, ফেল করেছি। পঁচা ছাত্র হয়ে গেছি। এখনো ২ ক্রেডিট দরকার। তাই ক্লাসও নিতে হয় দুই-তিনটা।
ভালো না, এইসব ভালো না।

রিসার্চ এর অবস্থা তথৈবচ। ইন্টারনেট ভিত্তিক স্ট্রিমিং প্রোটোকল নিয়ে আমার নাড়াচাড়া করা। সেইখানে অনেক থিওরিজাতীয় বিশ্লেষণ, অনেক সিম্যুলেশন করে সবশেষে সিদ্ধান্তগুলোকে সন্নিবেশ করার পর চূড়ান্ত প্রস্তাবনার জায়গায় এসে আটকে গেছি। মাথা যে আসলে গোময়ে ভর্তি - নতুন করে নতুন ভঙ্গিতে উপলব্ধি করতে থাকি সবসময়।

অবশ্য ভালো না থাকার কাছে এইসব খুব খুব গৌণ। নিরুপায় পুড়ে যাবার গল্প মনে পড়ে সবসময়। সেই গল্পগুলোকে চাপা দিতে চাই। এইখানেও লিখতে ইচ্ছে করে না। কী হবে লিখে?

ধর্ম, বৈষয়িক বাস্তবতা
কয়েক দিন দাড়ি কাটি না। জঙ্গল হয়ে গেছে মুখটা। সপ্তাহ দুয়েক আগ পর্যন্ত ইন্টার্নের জন্যে সেজেগুজে অফিসে যেতে হতো, তাই এইসবের উপায় ছিলো না। এখন ইচ্ছেমতো সাজি, ইচ্ছেমতোন থাকি। চার-পাঁচ দিন দাড়ি পরিষ্কার না করলে বেশ একটা দ্বীনী ভাব চলে আসে। ভয়ে ভয়ে থাকি স্কুলে ইন্দোনেশিয়ান ভাই-বেরাদরেরা আবার দাওয়াত দেবার জন্যে জোর-জবরদস্তি না করেন। ওনারা এই বিদেশ-বিভুঁইয়েও ইসলামের প্রতি ভালোবাসা বজায় রাখার জন্যে সচেষ্ট কি না।

কালকে বোধহয় ঈদ ছিলো। ঈদ-উল-আযহা। লাখে লাখে পশুকে জবাই করে ইসলাম যে কী শিক্ষা দিতে বলেছে - মুহম্মদই ভালো বলতে পারতেন। মাঝখান থেকে, পশু কিনে জবাই করে মাংস বিলি করার স্ট্যাটাস রক্ষার জন্যে পকেট নিয়ে টানাটানির মধ্যবিত্ত পড়ে গেছে শাঁখের করাতে।
আমি মনে করি, এই কোরবানির ব্যাপারটা বাংলাদেশে অনেক পরিবারের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তারপরেও বাধ্য হয়ে অগত্যা পালন করে। পাড়া-পড়শী কী বলবে, আত্মীয়স্বজন কী বলবে - এইসব ভেবেই কোরবানি দেয় বহু মানুষ। এইসব ভেবে হতাশা ছাড়া কিছু অনুভব করি না।

দেশে যাবো?

হাতে টাকা ছিলো খরচ করার মতোন। তাই দেশে যাওয়ার জন্যে টিকেট বুক করেছি ক্রিসমাসের মৌসুমে। যাবো কি না এখনো জানি না। ইচ্ছে অনুভব করছি না খু্ব একটা।
জাপানে সবচেয়ে বড় উৎসব - নববর্ষ। পুরনো বছরের শেষে আর নতুন বছরের প্রথমে হালকা ছুটি থাকে, সপ্তাহ খানেক। দেশে যাওয়ার ব্যাপারে সবাই রোমান্টিক হয়ে ওঠে কিংবা আবেগপ্রবণ। আমি সামান্যতম অনুভব করি না এইসব এখন আর। তারপরও ফিরি। অনেকটা নিয়ম মানার জন্যে।

গত বছর এই সময়ে গিয়েছিলাম চারদিনের জন্যে, জনকের অসুস্থতার খবর পেয়ে। যাওয়ার দশ ঘন্টা আগে টিকেট যোগাড় করেছিলাম JAL আর ANA মিলিয়ে। অস্বাভাবিক যাওয়া ছিলো সেটা। স্বাভাবিকভাবে গেলে এদের নিজস্ব ফ্লাইট না থাকায় এবং দামের কারণে কখনোই এদের কাছ টিকেট নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ANA মাইলেজ ক্লাব এর একজন গোল্ড মেম্বার পাশে ছিলেন সেই সময়। তার কল্যাণেই পেয়েছিলাম।

হয়তো দেশে যাবো এইভাবেই, বাড়িতে অস্বস্তিকর বন্দী থাকবো কয়েকদিন। ফিরে আসবো আবার। আগের লাইনে বাড়ি শব্দটা লিখে অনেকক্ষণ লেখা বন্ধ করে ভাবলাম। হাসি আসলো। বাড়ি কী? পরিবার? শেকড়? হাহ হা। কী হাস্যকর এবং অ্যাবসার্ড সবকিছু। হয়তো আপনি বলবেন, যাদের বাড়ি নেই, কখনোই কোন পরিবারে থাকে নি, তাদের কথা ভেবে দেখতে পারো। আমি তাহলে বলবো, তাকে আমার ঈর্ষা হয়।
ব্যক্তিগত গল্পে ফুলস্টপ দিই এবার।


অর্থনীতিতে অন্ধকার?
আজকে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর বৃহৎ নির্মাতা সনি ঘোষণা দিয়েছে, তারা পুরো পৃথিবীতে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে ১৬০০০ কর্মী ছাঁটাই করবে। শক্তিশালি ইয়েন, দুর্বল ডলার ও ইউরো র প্রভাব তো আছেই, তার উপরে মার্কিন এবং ইউরোপীয় বাজারের সংকোচনের ধাক্কার ফলাফল এই রিস্ট্রাকচারিং। এই ধাক্কা সামনে আরো আসবে বলেই মনে হচ্ছে। অন্যদের অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়।

ফোর্ড, জিএম, ক্রাইসলার এর জন্যে সরকারি সাহায্য আসছে। খবরে বলা হচ্ছে, মার্কিন সরকার নিজেই এসব কোম্পানির অংশবিশেষের শেয়ার নেবে। মজাই পেলাম বেশ। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার অসুখ হলে তা সারাইয়ের উপায় কি তাহলে সমাজতান্ত্রিক পলিসি? পুঁজিবাদী অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলো যেন এতোদিনে সবাই একসাথে জেগে উঠেছে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলোর দুর্দশার কথা বলার দরকার বোধ করছি না। বেয়ার স্টেয়ার্নস এর সাবেক সিইও গ্রীনবার্গ আজ বলেছেন, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং এর যে বিজনেস মডেল ছিলো, তাকে নিয়ে আর আশা না করাই ভালো।
তথাস্তু।

যাই হোক, এই অন্ধকারেও প্রতিদিন নানা স্টিমুল্যান্ট আসে বিভিন্ন সরকারের কাছ থেকে। মার্কেট চাঙা থাকে। সবাই সচল থাকে। আগামীতে পলিসি হয়তো আরো আসবে।
দিনশেষে, অন্ধকার দূর হলেই খুশী হই। কারণ এই সময়ে, এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের বাঁচতে হবে আমাদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়।

-
ছবি - নিজস্ব, কিয়োতো, নভেম্বর ২০০৮

৩টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

erokom hoye jaccho keno din din? kivabe somvob eto change hoye jawa?

রাশেদ বলেছেন...

ফটুকটা কি নিজের তোলা?

সৌরভ বলেছেন...

নামহীনকে চিনলাম না। কেয়ারটুকুর জন্যে ধন্যবাদ।

রাশেদভাই,
হ্যা।