"পরাণো কান্দে তোরো লাগিয়া"

বুড়ো হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন।
একেকটা মুখ এসে স্মৃতির দরজায় টোকা মারে।

উপমা নামের মেয়েটা আমার সাথে পড়তো, সেই ছোটবেলায়, ক্লাস ওয়ান-টু, নামটা মাথায় ঢুকে পড়ে আছে। আমি ফার্স্ট হবো, না সে - এরকম একটা প্রতিযোগিতা ছিলো বোধহয়।
কিংবা জিমি, যার সাথে একবার চিনিকলের গাড়ির পেছনে ঝুলে পড়ে আখ চুরি করে খেয়েছিলাম। হাফপ্যান্ট বয়েসের কথা, অজ-মফস্বল শহর পট হয়ে আছে যে ছবিতে। করতোয়া নদী চিরে গেছে যার বুক।
আমার জনকের ছিলো ব্যাংকের চাকুরি, ঘুরপাক খেতাম উত্তরের মফস্বলে।

উপমার বাবার প্রশাসনে বদলির চাকুরি ছিলো, তারপর উপমাকে খুঁজেছিলাম বড় হয়েও, যদি কোথাও দেখা হয়ে যায়, আরে! তুই সেই পিচ্চিটা নাহ? টাইপের আবিষ্কারের আশায়।

যেমনটা দেখা হয়ে গিয়েছিলো ফয়সলের সাথে, ক্লাস থ্রিতে ছেড়ে আসা কিন্ডারগার্টেনের ফয়সল - দেখা হলো আহসানউল্লাহর সামনে হঠাৎ একদিন, যন্ত্রপাতির ভার্সিটিটায় ভর্তি হতে এসে। মাঝে অবশ্য ১০-১১ বছর। আরে, তুই তো সাইজে বাড়িসনি - চিৎকার্ করে ওঠা, নতুন ধরনের দেখা হয়ে যাওয়া।
কিংবা অনির্বাণ, সেই বিশালদেহী বন্ধুটা, যার নিষিদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার ছিলো আমাদের কিশোর বয়সের বিস্ময়, ক্লাস সিক্সে চলে গেলো ইন্ডিয়ায় - ইঁচড়েপাকা, আমাদের সাথে পড়ার জন্যে একটু বেশি বয়েস ছিলোই বোধহয়। অনির্বাণ, আবার যদি দেখা হতো তোর সাথে রে!
অথবা ইমন, কতোদিন পরে তোকে খুঁজে পেলাম, চলে গেছিস সুইডেনে, পৃথিবীর অন্ধকার অংশে থাকিস - ২ ঘন্টা সূর্যের আলোর দিনও পার করিস নাকি- একদিন বলেছিলি। গুগল টকে তোকে দেখি মাঝেমধ্যে - নক করার সাহস হয় না কেন যেনো!

স্বপনটার সাথে তো আর দেখাই হলো না। ওর সাইকেলের ক্যারিয়ারটা বরাদ্দ ছিলো আমার জন্যে। দূরত্ব বাড়ার শুরু কলেজ থেকেই - তারপর ছিটকে পড়া।

সব মুখ একসাথে ঘুরপাক খায় এই রজত জয়ন্তী পার করে আসা জীবনটায়। সব প্রতারক আর ভন্ড।
এই লগ্নে হারানো সূচি, যে ছেড়ে যায় এই কাটখোট্টা জীবনের দুঃস্বপ্নদের মাঝে আমাকে একা ফেলে রেখে, সবকিছু পায়ের নিচে ফেলে। স্বার্থপর!

কেউ কথা দিয়ে কথা রাখেনা।
কেউ নাহ। আমার অভিমানের আকাশটা বড় হতেই থাকে। আবার দেখা হবে - কথাটাও মিথ্যে। দেখা হয় না কারো সাথে।
আমি অপার হয়ে বসে থাকি তোদের জন্যে। ইচ্ছে হয়, চিৎকার করে বলি - তোরা কেউ কথা রাখিস নি।

রিনরিন বেজে যায় কান্না আমার ছিঁচকাঁদুনে হৃদয়ের কোণে।
"বন্ধুয়ারে, পরাণ যে কান্দে তোরো লাগিয়া!"
আবার যদি দেখা হতো তোদের সাথে রে।

-----
রোববার, আগস্ট ৫, ২০০৭

সময়  

5 মন্তব্য:

নজমুল আলবাব said... Sunday, August 05, 2007 3:24:00 PM  

হু হু করে উঠল বুকের ভেতর। কিযে বিষন্নতা, কিযে কষ্ট...

কেমন আছ সৌরভ? এভাবে মন খারাপ করে দেয়ার অধিকার তোমায় কে দিল?

সৌরভ said... Sunday, August 05, 2007 4:08:00 PM  

স্যরি, নজমুল ভাই, মন খারাপ করে দেয়ার জন্যে।
ভাল নেই রে ভাই। এইসব পথ চলা আর এইসব মুখোশ পরা ভণ্ডামি আর ভাল লাগে না।

Anonymous said... Friday, August 17, 2007 12:03:00 AM  

হারিয়ে যাওয়া সেইসব বন্ধুদের জন্য আসলেই মন কেমন করে উঠে! স্কুলের অনেক বন্ধুদের এখন হয়তো দেখলে চিনতেও পারবো না। অথচ একটা সময় তারাই ছিল সবকিছু।
সৌরভ আপনাকে, আপনাদেরকেও মিস করি খুব। সামহোয়ার ইনের সেইসব দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে গেছে!
ভাল থাকবেন। যতোটা ভালো থাকা যায়...
আপন তারিক

সৌরভ said... Friday, August 17, 2007 2:21:00 PM  

আপন তারিক,
কৃতজ্ঞতা মতামতের জন্যে।

অনেকদিন পরবাসে থেকে এখন স্কুলের বন্ধুদের নাম ভুলে গেছি অনেকের। খুব কষ্ট হয় মাঝেমাঝে।

"সামহোয়্যার" এর সোনালি দিনগুলি ফুরিয়ে গেছে।
এখন গতানুগতিক একটা অর্থহীন ফোরামের মতো টিকে থাকবে হয়তোবা। কিন্তু, কর্তারা জানলেনও না "বাঁধ ভাঙার আওয়াজ" কী করতে পারতো আর কোথায় পৌঁছুতে পারতো।

Anonymous said... Friday, August 17, 2007 7:27:00 PM  

আসলেই ইর্ষনীয় একটা অবস্থানে উঠে যেতে পারতো বাঁধভাঙ্গার আওয়াজ। কিন্তু যেভাবে এখন সামহোয়ার রাজাকারদের ছানাপোনাদের অভয়রান্য হয়ে উঠছে, তাতে এটা একসময় জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের আনঅফিসিয়াল ওয়েবসাইটও হয়ে যেতে পারে!
সত্যিই খারাপ লাগে এতো সুন্দর একটা প্লাটফর্ম কি হয়ে যাচ্ছে! যাদের লেখা পড়তে সাইটে ঢু মারতাম তাদের বেশিরভাগই এখন নেই!
-আপন

Post a Comment