সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০০৭

কীভাবে লিখবো আমার শেষ কবিতাটি?

প্রাণহীন হয়ে পড়া নগরের যাপিত জীবনে, নিজের প্রাণেও মৃত্যুর ছোঁয়া অনুভব করি কয়েকটা দিন। সারাবছর চাবি দেয়া যন্ত্রের মতো চলতে থাকা, এই দেশটায় নিউইয়ার এর সামনে-পেছনে প্রায় এক সপ্তাহ যেনো শ্মশানের ক্লান্তির ছায়া নেমে আসে। নগরের নয়, এমন মানুষেরা সব্বাই বছরে একবার হলেও বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে, বছরের বারো মাস চাবিটেপা পুতুলের মতো দৌড়ে চলা মানুষগুলো সামান্য হলেও ভুলে থাকা শেকড়ে ফিরে নিজেকে নতুন করে পাওয়ার চেষ্টা করে সম্ভবতঃ। আত্মজনের সাথে এক টেবিলে এক গ্লাস বিয়ার গিলে সামাজিকতা পালনের চেষ্টাও করে বোধহয় কেউ কেউ।

এই শহরে কখনো বন্ধ না হওয়া সুপার মার্কেটও দুটো বা একটা দিন বন্ধ হয়ে যায়; সারাবছর দাড়িয়েও টিকতে পারা যায় না ট্রেনে, বসার সীটগুলো খালি পড়ে থাকে; সাবওয়ের রেলস্টেশনগুলোকে দ্বিমাত্রিক জগত থেকে উঠে আসা কোন পট বলে ভ্রম হতে থাকে। প্রাণের অভাবে, জেঁকে বসা শীত নগরকে আরো কামড়ে ধরে।

এইসব কিছুর মাঝে বছরের এইসময়ে মৃত আমি আরো মৃততর হয়ে উঠতে থাকি। অন্যসময়ে ব্যস্ততার প্রলেপে চেপে রাখা যন্ত্রণাগুলো এইসময়ে আমাকে পতিত করে তোলে।

এই সময়টায় স্মৃতিকাতর আমাকে, শীতল সব স্মৃতিরা আরো কুরে কুরে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করে। মনে পড়ে, স্কুলজীবনে ডিসেম্বর মানে, পরীক্ষাশেষে পড়াশুনার চাপ ছাড়াই ইচ্ছেমতো সময় কাটানো, বকুনি খাওয়ার ভয় ছাড়াই যতক্ষণ ইচ্ছা টিভি দেখা, এ সপ্তাহের নাটক অথবা মঙ্গলবারের সাপ্তাহিক কিংবা রোবোকপ অথবা সিন্দবাদ এর বাংলা ডাবড ভার্সনে বুঁদ হয়ে থাকা। অথবা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করা তিন গোয়েন্দা কিংবা কুয়াশা র ভল্যুমগুলো নিয়ে লেপের নীচে ঢুকে পড়া। কিন্তু, ইদানিংকালে নতুন করে বুঝি, এইসব আবছা আবছা ধোঁয়ামাখা স্মৃতিরা সময়ের সাথে সাথে মুছে যেতে থাকে।

পেছনে পড়ে থাকা আমার শৈশব আরো পেছনে চলে যায়, দূরে সরে যেতে থাকে। এই ২৫ এর অবস্থান থেকে দেখলে আমার পুরো দেশটাই আমার পেছনে পড়ে যায়, খুব ছোট দেখাতে থাকে সবকিছু। খুব যে অবাক হই, তা নয় - ১৭ তে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রাকটিক্যালগুলো শেষ হয়ে গেলো যেদিন - তার দুদিন পরেই ঘর ছেড়ে ঢাকা যাওয়ার বাসে উঠে বসেছিলাম কোচিং করবার জন্যে। সেই শুরু। তারপরে নিজঘরে, নিজভূমে অতিথি বাকিটা সময়।
তারপরে অনেকদূর, অনেক সময়। ঘরকুনো অন্ধকার অনুভূতিশূন্য কেউ একজন আমি অন্ধকার নির্বাসনকেই বরণ করে নিই জীবনের পরিণতি হিসেবে।

অস্বীকার করতে চাই না, আমার আমিত্ব অন্ধকার ভরা। হৃদয়ে আমি মৃত্যুর ছায়া দেখি প্রতিনিয়তই। আমি পরিবারের ভালোবাসার লোভে বাঁচতে চাইনা, কারণ আমি স্বার্থপর। ধর্মকে অবলম্বন করে বাঁচি না আমি অথবা, ধর্মহীন ঈশ্বরহীনতায়ও নয়, কারণ আমি ভন্ডামির ধারক।

আহ, আপনি নিশ্চয়ইআশা-র কথা বলবেন? তার সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, মধুচন্দ্রিমার আগেই।

এই পাতাটি পড়তে থাকা আপনি "The Shawshank Redemption" নামের একটা চলচ্চিত্র নিশ্চয় দেখে থাকবেন, তরুণ ব্যাংকার অ্যান্ডি তার স্ত্রী ও স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক কে হত্যার মিথ্যা অভিযোগে কুখ্যাত শশ্যাঙ্ক জেলে নিক্ষিপ্ত হবার পরেও শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে নিজের চেষ্টার জোরে, অনেক নাটকীয় ঘটনার পরে। আশা ছিলো একমাত্র বস্তু, যা তাকে জেলের কুঠুরিতে রিটা হেওয়ার্থ এর এক বিশাল পোস্টারের পেছনে ছোট হাতুড়ি দিয়ে গোপন সুড়ঙ্গ তৈরির মতো অসম্ভব এক কাজে প্রেরণার জোগান দিয়ে যায়। এক আশা আর জেলে তৈরি হওয়া বন্ধুত্বের ভালোবাসার জোরে শশ্যাঙ্কের জেল থেকে অ্যান্ডি সুয়্যারেজ পাইপ দিয়ে হাটুমুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে মুক্ত বৃষ্টির অবগাহনে। অস্বীকার করবার উপায় নেই, নায়ক অ্যান্ডির চরিত্রে টিম রবিন্স এর মুক্তবৃষ্টিস্নান এর সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি আবেগপ্রবণ যে কাউকে আপ্লুত করে তুলবে অবশ্যই।

অনেকদিন পর পরশু আবার দেখলাম এই চলচ্চিত্রটি। উহুহ... একে ধর্মবিশ্বাস বা নৈতিকতার তথাকথিত জয়, অর্থাৎ হ্যাপি এন্ডিং এর প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিচ্ছু বলে বোধ হয়না।

তাহলে এই ভন্ড আমি-র মুক্তি কোথায়? মৃত্যুতে?
বহুদিন আমার মূর্খ ও ভন্ডামি ভরা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এই নিয়ে বিব্রত বোধ করেছে। ধর্মকে বিশ্বাস করলে মৃত্যুতে মুক্তির কোন প্রশ্নই আসেনা, মৃত্যু আরেক নির্বাসনের দরজা সেখানে। ধর্মের ভিত্তি ছাড়িয়ে নিলে, মৃত্যু অসার এক "নাই" এর জগত। মৃত্যু সেখানে সত্যিকারের প্রস্থানপথ, শ্যামসম।

কোনওভাবে জীবনকে টেনেটেনে যাপন করার চেষ্টার থেকে "প্রস্থানপথ", আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হবার যথেষ্ট কারণ যেখানে উপস্থিত, সেখানে খুব সত্যি করেই ভাবতে ইচ্ছে করে, কীভাবে লিখবো আমার শেষ কবিতাটি?
কীভাবে রচনা করবো আমার শেষ গান?

বুধবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০০৭

ডিপ্রেশন?

অন্য সব বছরের মতোই আরেকটা শীত। আরেকটা সৌরবর্ষের শেষ। নতুন বছরের আগমন। সেইসাথে ছুট্টি!
রাস্তায় কমে আসা মানুষের আনাগোনা, আশপাশের ব্যস্ত ও অতিউদ্যমী কর্মঠ মানুষগুলোর আত্মজনের কাছে ফেরা অথবা ব্যস্ততার মাঝে একটা ফুলস্টপ দেবার জন্যে, কিংবা কয়েকটা দিন জিরিয়ে নেবার জন্যে শেকড়ের মুখোমুখি হওয়া। অথবা, ছুটি উপভোগ করবার জন্যে উড়াল দেওয়া অন্য কোথাও।
আমার সেসব দলে থাকা হয়না কখনো। লুজারদের জন্যে এইসব নয়।
আমি ঘুম থেকে উঠি অনেক বেলা করে, ১০টা-১১টা। না করলেই নয় দুয়েকটা জব এন্ট্রি বা ওয়েব টেস্ট, সামান্য পড়াশোনা। কষ্ট চেপে একেকটা পৌনঃপুনিক দিন পার করা। ওয়েব সার্ফিং করিনা, ভাল লাগেনা ব্লগিং কিংবা ট্রলিং।

তাহলে ভয়ে ভয়ে থাকা ডিপ্রেশন শেষ পর্যন্ত?

মাঝেমাঝে আইএইচটিতে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস এর কলামগুলো পড়তে বসি। আজ পড়ছিলাম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ফ্রিডম্যান এর এই লেখাটি

উনি বলছেন - বছরের এই উৎসবের সময়টায় আমাদের অজান্তেই প্রাকৃতিক নিয়মেই লাখ লাখ মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগেন, নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে বসেন এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে গুটিয়ে নেন। যাকে বিশেষজ্ঞেরা সিজনাল এফেক্টিভ ডিজঅর্ডার বা SAD বলে অভিহিত করছেন।

ফ্রিডম্যান আরো বলছেন, পুরো ব্যাপারটা আপনি কাটিয়ে উঠতে পারেন, গায়ে রৌদ্রজ্জ্বল সকালের আলো লাগিয়ে। বছরের এই সময়টায় ছোট হয়ে আসে দিন, কমে আসে রোদের তাপমাত্রা, স্যাড এ আক্রান্তদের মস্তিষ্কে অন্ধকারের সংকেত বাহক মেলাটনিন নামের হরমোনটির মাত্রা যায় বেড়ে। কয়েকটা দিন একনাগাড়ে সকালের আলো গায়ে লাগান, নেগেটিভ আয়ন গ্রহণের সুযোগ বাড়ান, কাজ হতে পারে।

হুহ, ফ্রিডম্যান যা বলেছেন, তাই সঠিক। তবে তার থেরাপি আমার জন্যে নয়। সংজ্ঞা অনুসারেই, আমি সিজনাল এফেক্টিভ ডিজঅর্ডারেও আক্রান্ত নই। সামথিং এলস মাস্ট বি রং উইথ মী।

শুক্রবার, ডিসেম্বর ২১, ২০০৭

আটপৌরে জীবনের চিরন্তন একাগল্প

১.
:: ডিসেম্বর ২১, ০৩:৩০ ::
ঘড়ির কাটা ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে রাত দুটোর ঘর, স্কুলের বড় গেটটা ছাড়া সব বন্ধ হয়ে গেছে, তাই বিরক্তির সাথে এই প্রায় শূন্য ডিগ্রি ঠাণ্ডার মাঝে, জোরে সাইকেলে প্যাডেল ঘুরিয়ে ঘুরপথে ছোট ঠিকানায় ফিরি। বাসায় ফিরে ল্যাপটপের সিডি ড্রাইভে বুট সিডি ঢুকিয়ে দিয়ে, পাওয়ার অন করে, শাওয়ার নিতে ঢুকি।
ল্যাপি বাবাজির কি যেন হয়েছে, ডিস্কের পাওয়ার খুঁজে পায়না, সিডি থেকে ডিভাইস ড্রাইভার লোড করে, অনেকক্ষণ পর রিস্টার্ট দিলে কাজ হয়, তাই শাওয়ারে ঢোকার আগে অনেকটা কাজ সেরে রাখি।

এই সিমেস্টারে যে তিনটা ক্লাস করতাম, তার একটার মিডটার্ম অ্যাসাইনমেন্ট এর ডেডলাইন কাল।
নতুন তারবিহীন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এর জন্যে জাপানে ২.৫ গিগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি বন্টনের কাজ মোটামুটি শেষ। ওয়াইম্যাক্স নামের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারবিহীন ব্রডব্যান্ড এর কাজের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে কেডিডিআই আর উইলকম। কেডিডিআই র সাথে চিপদৈত্য ইন্টেল আছে, তাই বলাই বাহুল্য, তারা ওয়াইম্যাক্স ব্যবহারে এক পা এগিয়ে।

এই প্রেক্ষাপটে পরবর্তী তারবিহীন ব্রডব্যান্ডে আইএসপি, সেল ক্যারিয়ার আর ডিভাইস মেকার - কার অবস্থান কীরকম হবে, সেই নিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট।
একটা দিন গেলো এই নিয়ে। তবে সামনে আসছে শুভদিন ....
তার ছাড়াই ব্রডব্যান্ড স্পিড পাওয়া যাবে - ভাবতেই ভালো লাগছে।

চাকুরি শিকারে আপাতত একটা "কমা" দিসি।

ফুলস্টপ দেই নাই অবশ্য, শীগগিরই ভালোমতোন কিছু শুরু না করলে না খেয়ে মরতে হবে এক বছর পর থেকে, সেইটা মাথায় আছে। সামার ইন্টার্ন করছিলাম যেইখানে, সেই গোল্ডম্যান স্যাক্স ছ্যাঁক দিছে, তবে সামান্যতম দুঃখ পাই নাই, কারণ ছ্যাঁকের তো কেবল শুরু। চলছে চলবে এইসব। তবে ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম গুলানের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবী এখন চীনা বা এশিয়ান রঙে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে প্রস্তুত। মোটামুটি ক্ষতবিক্ষত মেরিল লিঞ্চ , মরগ্যান স্ট্যানলে, অন্যেরাও। ফার্মগুলানে ক্যাশ ইনজেকশন হইতেসে চীন বা সিঙ্গাপোর থেকে।

আমি আংভাঙ কম্প্যু সায়েন্সই ঠিকমতো বুঝি না আর এতো আমার পড়াশুনারও বাইরে, তাই এতোকিছু বুঝি না, তবে এই দুনিয়ায় নতুন দিনের শুরু মনে হয়।

কী ধরনের চাকুরির জন্যে ধান্দা মারা যায়, সেইটা নিয়েও একটা লাট্টুর উপরে আছি। সময় নাই, সিদ্ধান্ত একটা মনে হয় নিতেই হয় এবার।
শেষ পর্যন্ত কোনখানে যে যাইতে পারি! পেটের ভাত জুটবে তো? লাট্টু ...র উপরে সারাজীবন কাটলে তো সমস্যা।


২.
:: ডিসেম্বর ২১, ২৩:৩০ ::
সারাটা দিন খুব একটা কোন কাজ করিনাই। আউটপুট ছাড়া দিন বড়ই বিরক্তিকর।
এতোক্ষণ ল্যাবের খুব কাছাকাছি সিনিয়র-জুনিয়রদের সাথে ওকোনোমিইয়াকি ভক্ষণ আর আনুসঙ্গিক পানাহারে ব্যস্ত ছিলাম। সবাই নানান ব্যাপারে ইদানিং বেশ অস্বস্তি বোধ করে, তাই পানি পেটে পড়লেই বিষ বের হয়ে আসে সবার মুখ থেকে, আমিই একা পানিবিহীন গ্লাস নিয়ে শুনে যাই এবং তাল দেই। স্ট্রেস ঢালার জায়গার বড় অভাব বেচারিদের, তাই অপ্রিয় সবকথন চলে মদ্যসহযোগে।
এখন বাসায় ফিরবো। মাথা ব্যথা করছে ভীষণ। মাথায় যে কী হইসে?...

৩.
:: ডিসেম্বর ২৩, ০৩:৪০ ::
এতো রাতে জেগে থাকি কেনো? কে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলো গুগল টকে অনলাইন দেখে। উত্তর জানিনা। ইনসোমনিয়া? হ্যাঁ বা না কোনটাই বলবো না।

বাইরে বৃষ্টি সন্ধ্যা থেকে, একটা অলস দিন শেষে শুয়ে আছি। ঘুম থেকে উঠেছিলাম দুপুরের দিকে, অবশ্য ঘুমিয়েছিও ভোরের শেষে। সন্ধ্যা পর্যন্ত হাবিজাবি ব্রাউজিং - অনেকদিন পরে একটা P2P ফাইল শেয়ারিং টুল ইনস্টল করলাম। আই এম লিজেন্ড নামালাম, এখনো দেখা হয়নি যদিও। তারপর চাকুরির এন্ট্রিশীট জাতীয় কিছু প্রস্তুতিকাজ করার জন্যে ল্যাবে গিয়ে বসি নিজের কাস্টমাইজড ডেস্কে।

সন্ধ্যায় মটরের ডালের কারি আর নান - বাংলাদেশি দোকান থেকে প্যাকেট।
অনেকদিন রান্না করা হয় না - হিমু ভাইর রেসিপি দেখলে রান্না করতে ইচ্ছা করে, ট্যুনার কাবাব, ডিমের কারি এইসব গরিবী রান্না যদিও বড়ই অপছন্দ, অনেকদিন তো হলো এইসব রান্না।
প্রায় আধযুগ? জীবনের চারভাগের একভাগ! হুহ..
মস্তিষ্কে এইসব খাবারের উপর একটা বিতৃষ্ণার অনুভূতি স্থায়ী হয়ে গেছে।

৪.
::ডিসেম্বর ২৪, ০৩:৩০::
ডিসেম্বর ২৩ আরেকটা নিস্ফলা দিন। রোববার, ঘুম থেকে ওঠা স্বভাবতই দেরিতে, অনেক দেরি।
১২ টা পার করে। ঘরকন্নার কাজ, মেশিন থেকে কাপড় বের করে দেখি, রোদ পড়ে গেছে। কী আর করা, বস্তা বেঁধে বাসা থেকে কয়েকশ মিটার দূরে, কয়েন ড্রায়ারে দিয়ে আসি। আমার বাসায় ড্রায়ার নাই।
সন্ধ্যায় পার্থ আর রনি ভাইর সাথে ডিনার, অন্য সময়ের মতোই ঈশ্বরদর্শন বিষয়ক তর্ক দুইজনের, আমি অকাটমূর্খ শ্রোতা। চলুক, চলুক....তবে বেশি খাওয়া হয়ে গেছে ইন্ডিয়ান রেস্ট্যুরেন্টে। আর বিল খুব বেশি ছিলো।

শরীরটা ভালো নয়। আজ ঘুমাই।
ওহহো.,. ডিসেম্বর ২৩ সম্রাটের জন্মদিন। সম্রাট আকিহিতোর জন্মদিন, তবে রোববার বলে পাওনা সরকারি ছুটিটা কাল।


ফুরিয়ে যায় ২০০৭, পৃথিবীতে অচল মানুষ আমি আরো অচল হতে থাকি।
এইভাবে চলে আমার সবদিন। আটপৌরে জীবনের একাগল্পে এইসব দিন শেষে ভাবি, কালকে পৃথিবীতে আমাকে কী প্রয়োজন? আর প্রয়োজন যদি নাই থাকে, তবে এটাই কেনো শেষ দিন নয়?

-
ছবি কৃতজ্ঞতা , একই সাথে সচলায়তনে প্রকাশিত

সোমবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০০৭

ঘুরপাক

অনেকক্ষণ ধরে এই পাতায় শুরুটা কীভাবে করবো, সেইটুকুতেই ঘুরপাক খাচ্ছি। অনেকদিন কিছুই লিখিনা, লেখার মতো মানসিক স্বস্তিটুকু পাই না বলে। একটা চক্রের মাঝে পড়ে আছি, নিকট-অতীত আর টানেলঅন্ধকার ভবিষ্যত বিরক্ত করছে সারাক্ষণ।

এইসব কিছুর শুরু কি জুলাইয়ের শুরুতে?
আলো হয়ে ছায়া হয়ে লুকোচুরি খেলে যাওয়া - গানটা শেষ শুনেছিলাম যখন। বিশ্বাস ভাঙার যে দৃশ্যে আমি প্রায়-পাগল হয়ে চুপচাপ অন্ধকার ঘরে বসে ছিলাম পুরো একটা দিন।
অথবা আগস্টের শুরুর ভাগের কোনও এক রাতে, তারবিহীন ফোনের ওপারে শ্রদ্ধাস্পদ শিমুল অথবা আলবাব ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন - সৌরভ, বাবা কেমন আছেন? আমি যে রাতে ঘুমোইনি। পাথরসম আমি ছাদের দিকে তাকিয়ে পার করেছি অনেকটা সময়।
না সেটা শুরু নয়। এইসব কিছু একেকটা বিন্দু, জীবনের সাদা পাতায় একেকটা কালো বৃত্ত।

কিংবা ডিসেম্বরের শুরুতে আমি যখন কোনও এক বৃষ্টিভেজা সকালে কেএল এয়ারপোর্টে কোনও একটা কফি-শপে ঢাকার কানেক্টিং ফ্লাইট ধরবার জন্যে বসে থাকি বোধ অথবা বুদ্ধিহীন হয়ে। একটা লাল টুকটুকে শার্টের উপরে কালো সোয়েটার আর বাদামী মাফলার জড়িয়ে - এলিমেন্টারি স্কুলে পড়া আদুরে বাচ্চাদের মতোন সাজে সেজে।

অথবা দুইদিনের বিমানভ্রমণ শেষে মফস্বলে পৌঁছে আমার বাবার ইল্যুশনমাখা গল্প বলে যাওয়া বিছানার পাশে পাথরের মতোন বসে থাকা, কিংবা আমার সদ্য বিয়ে করা বন্ধুটিকে তার শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেবার পর ফেরার পথে রিকশাওয়ালার না থেমে বলে যাওয়া গা শিউরে ওঠার মতো গল্প, দুদিন আগে তার এক কাছের বন্ধুকে কীভাবে ঘাতকেরা অস্ত্রাহত করে ফেলে রেখেছিলো মফস্বল শহরে নতুন তৈরি হওয়া হাইওয়ের ধারে।

সবশেষে, চারদিনের প্রায় অসহায় এক সময় শেষে দেশ ছাড়তে গিয়ে ফ্লাইট মিস করে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেল্ফ-অফলোড এর জন্যে খালাম্মা ধরনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সামনে নতজানু হওয়া কিংবা ফেরার কানেকটিং ফ্লাইটের টিকেট ইনভ্যালিড হয়ে পড়া। এইসব ফর্মালিটিজ এর সামনে আমি দুর্বল হয়ে পড়ি ভীষণ ভীষণ। কিন্তু, সেইসব অস্থির অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি দিতে অজানা অচেনা মানুষেরা ভালবাসার ডালি নিয়ে হাজির হয় - যে ভালবাসা আমার প্রাপ্য নয়, তাতে আমি অস্বস্তি বোধ করি। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এরিয়া ম্যানেজার ভদ্রলোকটি অথবা আমাকে ভীষণভাবে ঋণী করে যাওয়া এরিকসন বাংলাদেশে চাকুরি করা সেই মানুষটি, যিনি সবকিছু বাদ দিয়ে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো সময় ব্যয় করেছেন আমার পেছনেই।
এইসব ভালবাসায় আমার অস্বস্তি বোধ হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রিয় আত্মজনদের কষ্টের কাছে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়েছে, আমি পালিয়েছি নিজের কাছ থেকেই।
আত্মজনদের কাছে আমার পুনর্বার ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে।
গত সপ্তায় চাকুরির ইন্টারভ্যু দিতে গিয়ে মাঝপথেই কেমন যেন বুঝতে পারি,আমাকে বোধহয় আর ডাকবেনা। তারপরে সত্যি হয়ে ওঠে সে আশংকা।

এইসবের শেষ নেই। আমার মুক্তি নেই, আমি জানি। ইনসোমনিয়া রা ঘুরেফিরে আসে, দুই বছর আগে ইনসোমনিয়াকে বিদায় জানিয়েছি মনে করেছিলাম - সেটা মিথ্যে বোধ হতে থাকে।
বর্তমানের টানেল শেষে কী আছে - সেই ভাবনাটুকু থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারিনা। সবকিছুই কি আমার জীবনের অংশ? অথবা আমি কেবল দর্শক? কিংবা এভাবে ভাবলে বোধহয় ব্যাখ্যেয় হয় প্রশ্নটা- আমিই কি তাহলে আমার দর্শক?

আমার হেঁটে চলা পথে, আমি বোধ ও বুদ্ধিহীন পাথর-মানুষে রূপান্তরের কিউতে দাঁড়িয়ে থাকি অনেক সামনের দিকে, ডাকের অপেক্ষায়।
--
ছবি কৃতজ্ঞতা

শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০০৭

ঝড়ে বিধ্বস্ত আমার মা, ভিনদেশির আহ্বান এবং নিরুপায় পরবাস


১.
ব্যস্ত এই জীবনে মনটা অস্থির হয়ে উঠলো, যখন বৃহস্পতিবার ল্যাবে তিনঘন্টার ম্যারাথন সেমিনার শেষে ডেস্কে এসে এই ছবিটা দেখলাম। কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইলাম। টাইফুনের দেশে পরবাস, সারাবছরে কমপক্ষে ১০-১৫ বার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে টাইফুনের চোখের ছবি দেখানো এই আবহাওয়া-চিত্রগুলো খুব ভালোভাবেই বুঝি।

তাই রুদ্র সাইক্লোনের চোখের সম্ভাব্য পথের সামনে নিজের ওই ছোট্ট আয়তাকার দেশটুকু দেখে, ভয়ে শিউরে উঠেছি, একানব্বইর কথা ভেবে। এখনো চোখের সামনে ভাসে, পেপারে লাল কালিতে বড় বড় হরফে প্রথম পাতার অর্ধেক জুড়ে লেখা, কাঁদো, বাংলাদেশে, কাঁদো

তারপর সিডর এলো। সারারাত মনের অস্থিরতা কমেনি। ভূমিতে আসতে আসতে অনেক সাইক্লোনের গতি কমে যায়, পথ বদলায়। প্রার্থনা করছিলাম যেনো সেরকম কিছু ঘটে। আমরা এমনিতেই দুর্ভাগা, আরো কতো কষ্ট সহ্য করতে হবে আমাদেরকে?
সকালে গুগল নিউজ চেক করেই বুঝতে পারি, পুরো বাংলাদেশ আহত। রেখে গেছে ক্ষত পথে পথে। গতকাল আর আজ খবরের কাগজ আর বিভিন্ন তথ্যসূত্রে যে ছবিগুলো ছাপা হচ্ছে। তাতে সহজেই বুঝতেই পারা যায়, হতভাগ্য বাংলাদেশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে গেছে প্রলয়।

কী করতে পারি আমরা? দুর্যোগ আসবেই, ভৌগোলিক অবস্থানটাই এরকম, কিছু করবার নেই।
কিন্তু এই মুহুর্তে কী করবার আছে আমাদের?

২.
কিছু করতে চেয়েছেন শেরিল কার্সেনব্যম (Sheril Kirshenbaum, ক্ষমাপ্রার্থী, উচ্চারণটা কেমন হবে, আমার জানা নেই)। ডিউক য়্যুনিভার্সিটির এই মেরিন বায়োলজিস্ট তাঁর এই ভিডিও ব্লগিং পোস্টে মানবিক এই দুর্যোগে হাত বাড়ানোর একটা আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর ব্লগের পাঠকদের প্রতি।
চোখদুটো আবার জলে ভরে গেলো, ভিডিওটা দেখে।



৩.
সুপরিচিত ব্লগার রেজওয়ান জার্মানি থেকে তাঁর এই পোস্টটিতে , যেখানে শেরিলের আহ্বানের কথাও উল্লেখ আছে, সেখানে তিনি দারুণ কিছু নির্দেশনা রেখেছেন হাত বাড়াতে আগ্রহী সহৃদয় সবার উদ্দেশ্যে। পাঠকদের সেই পোস্টটি পড়ার ও নিজেদের ব্লগে বা সাইটে কোনভাবে উল্লেখ করার অনুরোধ জানাই, যাতে ব্লগ সার্চ এর ফলাফল হিসেবে সেই নির্দেশনাগুলো উঠে আসে খুব সহজেই।
আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বলে, এই মুহূর্তে অর্থ বা ত্রাণ যথেষ্টই থাকবার কথা। কিন্তু জরুরি হচ্ছে সেগুলো পৌঁছুনো আর দেশের অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তা যতো কমানো যায়, সেই চেষ্টায় নিজের অংশগ্রহণ রাখা।
আর সবচেয়ে জরুরি, এই শীতের মধ্যে দুর্গতদের কাছাকাছি পৌঁছানো। সামনের শীতে মাথার উপরে ছাদ ছাড়া লাখ লাখ মানুষ থাকবেন - এটা মাথায় রাখা খুব খুব দরকার।

কীভাবে কি করা যায়, আমি জানি না।
নিরুপায় পরবাসে চোখ ভিজে যায় খুব সহজে, তাই লিখতে ইচ্ছে করলো এই লেখাটা। অর্থ-সমর্থন দিয়ে দুঃখ লাঘব হয়না, সেইটা খুব নিরুপায় একটা পথ। (আমি অর্থ-সাহায্য শব্দটি অপছন্দ করি ভীষণ )

তবু্ও বলি,
নিরুপায় অর্থ-সমর্থন দেবার জন্যে আমিও অন্যদের মতোন, রেডক্রস-রেডক্রিসেন্ট অথবা সেভ দ্য চিলড্রেন কে প্রথম পছন্দ হিসেবে মেনে নেবো। আমি জানি এখানে ভলান্টারি কাজ করে যাওয়া এনজিওতে গুলোতে কাজ করেছেন বা এখনো করেন, এরকম অনেকেই আছেন, তাঁদের কাছ থেকে কোন ধরনের তথ্যসংযুক্তি থাকলে কৃতার্থ হবো।

এইসবে কিছু হয় কি না আমি জানি না।
ফেসবুকে বা অর্কুটে গ্রুপ করে কিছু হয় না, এটা জানি - (কারো ভিন্নমত থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী)। কিন্তু মিডিয়া কাভারেজ বা প্রচারণা খুব জরুরি - এটা বিশ্বাস করি। তাই এই বিনীত নিবেদন।

লিংক-
বাংলাদেশ রেড-ক্রিসেন্ট সোসাইটি
Bangladesh Red Crescent Society
A/C No. 01-1336274-01
Standard Chartered Bank
Dhaka Bangladesh
SWIFT Code: SCBLBDDX
Red Cross Red Cresent
Bangladesh: Red Cross Red Crescent launches urgent appeal in wake of Cyclone Sidr

Save the Children
Thousands of Cyclone Survivors in Bangladesh Need Your Support

সচলায়তনে দেয়া ইশতিয়াক রউফ ভাইয়ের লিংক
Association for Bangladeshi Students at Virginia Tech
http://www.bang.org.vt.edu/makhan.html

শুক্রবার, নভেম্বর ০৯, ২০০৭

নভেম্বরের কোন এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় ...

নভেম্বরের এই শুরুর ভাগে সন্ধ্যেটা নেমে আসে ঝুপ করে। ঘড়ির কাঁটা চারটা পেরোলেই একটা ঠান্ডা বাতাস আমার বসার জায়গার পেছনের জানলা দিয়ে হুহু করে ভেসে আসে। একটু দূরে বসা জ্যৈষ্ঠ সহকর্মীটি জানলা বন্ধ করে দেবার জন্যে তোড়জোড় করতে থাকেন।

আমার আপত্তিতে জোর করেই জানলাটা খোলা রাখা হয়, হালকা ঠাণ্ডায় মায়ের বকুনি খাবার পরেও গরম কাপড় না পরা দুষ্টু উদোম গায়ের বাচ্চাদের মতোন। জানলার কাছে চেয়ারটা সরিয়ে উঁকি দিই বাইরে। অন্ধকার আর আলোর মাঝামাঝি একটা "প্রায়আধার" বাইরে থেকে কেমন যেন অপরাধবোধ নিয়ে চোখ পিটপিট করে আমার দিকে থাকে, যেনো সে লজ্জ্বা পায় বেশি তাত্তাড়ি এসে পড়ায়, আকাশটাকে কালো করে দেয়ায়। তারপর আমার মুচকি হাসিমুখ দেখে সেও সাহস পায়, পুরোপুরি মুড়ে ফেলে আকাশটাকে, ওপারের নির্জীব ইচো গাছগুলো ড্যাবড্যাব দাঁড়িয়েই পড়ে অন্ধকারেই, বাতাসে ভেসে আসে ওই গাছগুলোর উপরে বাসা বাঁধা টিয়া পাখিদের কিলিকিলি, চিলিচিলি।

এই স্কুলের আন্ডারগ্রেডারেরা, যারা বেশিরভাগই নার্ড এবং স্বভাবতই অন্তর্মূখি, অনেকেই ক্লাস শেষে ক্লান্ত দেহ নিয়ে টেনেটেনে বাড়ি ফেরার জন্যে ইচো গাছগুলোর নীচে ওই রাস্তাটা ধরে হেঁটে হেঁটে চলে। আমি জানলার পাশেই চুপচাপ বসে থাকি। একই রুমে বসা আরেক সহপাঠী কফি খাবো কি না জিজ্ঞেস করে একটা ডাক দেয়, আমি হ্যাঁ-হুঁ মাঝামাঝি কিছু একটা বলে আবার ডুবে যাই বাইরের অন্ধকারের সাথে কথোপকথনে।

একটা সময় ছিলো, যখন হিসেব করতুম - আচ্ছা এখন দেশে কয়টা বাজে, মা কী করছে - আজ কী রান্না হয়েছে - আজকে বাজার কে করেছে। এখন মস্তিষ্কের ওই জায়গাগুলো প্রায় মুছে বসে আছে। ওই কোষগুলো কবে মরে আবার নতুনেরা জায়গা নিয়েছে কে জানে। কিন্তু আজ কতো বছর পর কেনো যেনো ভাবতে ইচ্ছে করছে - দেশে কেবল দুপুর পার হলো, দেশে থাকলে হয়তো শুধু লাউয়ের তরকারি, কোন অপ্রিয় মাছের ঝোল আর তেল দেয়া আলুর ভর্তা দিয়ে হয়তোবা দুপুরের ভাত খেতাম একটা গোসল ছেড়ে এসে।
হয়তোবা, হয়তোবা নয়।

কিংবা ফেলে আসা বন্ধুগুলোর মতোন একটা চাকুরি খুঁজে হাপিত্যেশ হতাম অথবা সস্তায় কোন চাকুরিতে দিন পার করতাম আরো ভালো কোন সুযোগের আশায়। তার থেকে এই বর্তমানই ভালো লাগে। হোক না, মাঝরাতে বাড়ি ফিরি, কিংবা শুকনো রুটি বা ওনিগিরি চিবুতে চিবুতে অনেক কিছু ভুলে থেকে জোর করে দিন পার করি।

এইসব ভাবতে ভাবতে অন্ধকার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। এইবার জানলা থেকে উঠি।
কী হতে কী হইনি, আর কোথায় থেকে কোথায় থাকিনি - এইসব দুঃখবিলাস মাঝেমাঝে নিজের কাছেই বিরক্তিকর ঠেকে। পানসে কফিতে চুমুক দেই। কফি ভাল্লাগেনা। এই ঘরটায় কফি আমার থেকে কেউ ভালো বানাতে পারেনা। সন্ধ্যেটা আরো বিষণ্ণ আর ঠাণ্ডা হতে থাকে।


নভেম্বর ০৯, সন্ধ্যে
ব্যাখ্যা - ইচো , ওনিগিরি
ছবি - পাঁচ বছর যেখানে কাটিয়েছি, আমার স্কুল

শুক্রবার, নভেম্বর ০২, ২০০৭

বৃত্তবন্দী

একেকটা সপ্তাহ দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যায়। সোম আসে, বিষ্যুদ আসে, আসে আরেকটা উইকএন্ড। ১২-১৪ ঘন্টা ল্যাবে-স্কুলে, মাঝেমাঝে ফাঁক বুঝে পাটর্টাইম, জব ইভেন্টে সুট-টাই পরে দাঁত কেলানো বা অন্যকিছু।

কাজের চাপ?
না, ভুল, আসলে কোন কাজই শেষ করতে পারিনা। সবই সিকিভাগ করে, অর্ধেক করে ফেলে রাখি। শেষ হয় না কোনকাজই।
নিজের পড়াশুনা যেখানে আছে, সেইখানেই পড়ে থাকে, রিসার্চ এর কাজ সামান্যতম হয়ে ওঠেনা, টনক নড়ে, যখন মাস্টারমশায় বলে বসেন, এই সপ্তায় সেমিনারে একটু গালি খেয়ে আসো - মানে প্রেজেন্টেশন দাও। চাকুরির অনলাইন অ্যাপ্লিকেশনগুলো করবো করবো করে করা হয়ে ওঠেনা। শীতের কাপড় কেনা দরকার, একটা ভালো জ্যাকেট, একটা মাফলার - অথবা মোজা - কেনা ফরজ হয়ে গেছে, অথচ সময় করে উঠতে পারিনা। রোজ সকালে সব মোজা র একটা করে কপি খুঁজে পাই, তার পেয়ার কে আর পাইনা।

খাবারের অভ্যাস খুব খারাপ হয়ে গেছে। রান্না করিনা অনেকদিন, দুই সপ্তাহ আগে ডাল রেঁধেছিলাম আর চিংড়ি ভর্তা, সেই শেষ। ফ্রিজে মুরগি আছে, কেনো যেনো কিমা করা মাংস কিনেছিলাম, সেটাও আছে। রান্নার সময় পাইনা। স্কুলে যাওয়ার পথে একটা ইন্ডিয়ান খাবারের দোকান হয়েছে দুমাস হলো- বাঙালি মালিক, জাপানি বউ সাথে নিয়ে রেস্ট্যুরেন্ট চালায়। ভালোই রাঁধে, ল্যাবে যাওয়ার পথে প্যাকেট লাঞ্চ কিনে নেই সপ্তায় দুইতিনদিন। আর আছে, ম্যাকডোনাল্ডস এ নতুন মেন্যু, ম্যাকড়্যাপ, না হলে পুরনো বন্ধু ফিলে-ও-ফিশ তো আছেই।

শরীরটা ভালো নেই। বয়স বাড়ছে, সেটা বুঝতে পারি খুব ভালোমতোই ইদানিং। মাঝেমাঝে নিজেই নিজের কাছে ছুটি নেই, কোন একটা সন্ধ্যে বা কোন একটা সকাল - শুয়ে শুয়ে টিভি দেখি বা মুভ্যি। টিভিতে স্ক্রীম-৩ দেখছি এখন। এই ভোররাতে। একবার দেখেছি, আবার দেখছি। গত সপ্তায় য়্যুটিউব ঘেঁটে পারমিতার একদিন দেখেছি বসে বসে। একটা অনুভূতি জাতীয় রিভিউ লেখার চেষ্টা করলাম, শেষ করতে পারছি না। রবীন্দ্রসংগীতগুলো অপূর্ব লাগে ছবিটায়। বিপুল তরঙ্গ রে - গানটাকে যেমন করে তুলে আনা হয়েছে, সেটা অসাধারণ। মনটা অদ্ভূত অনুভূতিতে ভরে ওঠে।

দেখতে দেখতে বছরটা ফুরিয়ে এলো, নভেম্বর মাস পড়ে গেছে। আগামী দুটো মাস কীভাবে যাবে - জানিনা। বছরের শেষে একটা টিকেট বুকিং দেয়া আছে দেশে যাওয়ার। অসম্ভব মনে হচ্ছে যাওয়াটা এই মুহূর্তে। শিগগীরই টিকেট ক্যানসেল করে দেবো মনে হয়।
আমার একটা বদভ্যাস ছিলো, দেশে বন্ধুদের সবাইকে মাঝেমাঝে ফোন করে চমকে দিতাম। অনেকক্ষণ কথা বলতাম। এখন আর করতে ইচ্ছে করেনা। মরে যাচ্ছে অনেক ইচ্ছে।

দিনগুলো সব একরকম মনে হয় মাঝেমধ্যে। পৌনঃপুনিক বৃত্তে পড়ে আছি বোধ হয়। রাত শেষের সকালটা অন্যরকম হবে, অথবা উইকএন্ড শেষের সোমবারটা অন্যকোন অনুভূতি নিয়ে শুরু হবে- প্রত্যাশাই করি খালি। হয় না সেরকম।
একই বৃত্ত ঘুরে আসে। বৃত্তটা ভাঙতে পারিনা।


বিপুল তরঙ্গরে.. পারমিতার একদিন থেকে


ছবি - সিসিএল এর আওতায় ব্যবহার। কৃতজ্ঞতা - ক্রিস ডায়মন্ড

রবিবার, অক্টোবর ২১, ২০০৭

পৌনঃপুনিক মৃত্যু

আমার বর্তমান পৌনঃপুনিক। ঘুরেফিরে একই বৃত্ত। রাত শেষে আবার একই রকম আরেকটা দিন।
আমার অনুভূতিরা মৃত, তাদেরকে ঘিরে পোড়া মূর্তিরা খেলা করে। তাধিন তাধিন ধিন।
উদ্দাম নৃত্য। দুহাত তুলে, বৃত্ত রচনা করে।

বেসুরো আঁশটে গন্ধ আমার চারপাশে, পোড়া শব অথবা মনপ্রসূত অবাস্তবতা। পাথরের ঘষঘষে শব্দ।
হৃদয়কে আহত করা কিছু সুর। নস্টালজিক এবং মেলানকোলিক। খুঁজতে থাকি।
পাই না, পাই না সেই গানটা। বিপুল তরঙ্গ রে.. রবি বুড়োটার গান।

আমি হারিয়ে যাই। আমার ঈশ্বর খুঁজে ফিরি।
বৃত্তটায় গা এলিয়ে দেই ব্যাখ্যাহীন নির্ভরতায়।

শনিবার, অক্টোবর ২০, ২০০৭

এইসব দিন শেষে বৃষ্টি আসে

সকালে এখন ভালো ঠাণ্ডা পড়ে। দেশি কাঁথা আর একটা হালকা ব্লাংকেট গায়ে দিয়ে কাজ হয় না যদিও, তারপরো থোড়াই কেয়ার করি এইসব।

তিন ধাপের অ্যালার্মদেয়াল ব্যর্থ হয় না, সময়মতোনই ঘুম ভাঙে। প্রথমে বাজে সচল সেলফোন। তার পাঁচ মিনিট পর চিৎকার দেয় বিছানা থেকে একটু দূরে রাখা অচল সেলফোনের সেটটা, যেটা গত এপ্রিলে বদলানোর পর এখন অ্যালার্ম ছাড়া অন্য কোন কাজে আসে না। তারও দশ পনের মিনিট পরে বেজে ওঠে টেবিলঘড়ি, যেটাকে বন্ধ করতে বিছানা ছেড়ে কমপক্ষে চার পা হেঁটে যেতে হয়।

এতো কিছুর দরকার নেই আসলে, বেশিরভাগ দিনই প্রথম চিৎকারেই কাজ হয়, ঘরজুড়ে প্রফেসর শঙ্কু ধরনের এই চিৎকার ব্যবস্থা তৈরির পরও, মাঝে মাঝে অবশ্য অ্যালার্ম বন্ধ করে আরেকবার ঘুমুতে গিয়ে বিপদ ঘটেনি তা নয়। তারপরো এতো কিছু করা, কারণ - সকালে আন্ডারগ্রেডারদের এক্সপেরিমেন্টে কামলা খাটতে হয়। তাও একা। কোনভাবে মিস হয়ে গেলে লজ্জ্বার ব্যাপার। সেই সম্ভাব্য লজ্জ্বা থেকে বাঁচতে অগ্রীম ব্যবস্থা।

এক্সপেরিমেন্টের তিনঘন্টা পুরোপুরি ফাঁকি দেই, নিজের কাজ করে যাই, সচলায়তনে উঁকি দিয়ে সমন্বিত বাঘ ও অপরিণত ঘুড়া ক্যামনে কি কইরলো তাই পড়ে হাসতে থাকি, বিবিসিতে মিজ ভূট্টোর ভীতশংকিত চেহারা ও মৃতের সংখ্যার অবলীলায় তিন ঘর পার করে যাওয়া দেখে হতবাক হই। অবশ্য কিছুক্ষণ পরেই, খুব বড়োজোর এক মিনিট সাতচল্লিশ সেকেন্ড পরে ভুলেই বসে থাকি যে, অল্প কিছু মুহূর্ত আগে আহত হওয়ার মতো কোন খবর পড়েছি এবং একদল ভীতসন্ত্রস্ত আহত মুখ ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্তাক্ত মানুষের স্থিরচিত্র দেখেছি।

মানুষের শোকের আয়ু লগারিদমিক স্কেলে কমে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। মানুষ নিদারুণ স্যাডিস্টিক হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমিও ব্যতিক্রম নই তার। অন্যের পিছলে পড়ায় মনে মনে হাসি আর পারলে নিজেই কলার খোসা ছড়িয়ে রাখি, যাতে পিছলে যায় সব্বাই।

এইরকম ভাবতে ভাবতেই দিনটা শেষ হয়ে যায়।
আজকের মনোরোগবিজ্ঞান এর ক্লাসে ডিপ্রেশন টেস্টটা অদ্ভূত ছিলো, কোনরকম বিস্তারিত নির্দেশনা ছাড়াই আপনাকে একটা ঘড়ির ছবি আঁকতে বলা হবে, এরপর ঘড়ির কাঁটা ও ডায়ালের অবিন্যস্ততা অথবা ঘড়ির বৃত্তের আকৃতি দেখে আপনাকে বিশ্লেষণ করা হবে। আমার ইচ্ছে করছিলো, একটা ডিজিটাল ঘড়ির ছবি আঁকতে। হিহি, এই টেস্টে ডিজিটাল ঘড়ি আঁকলে তাকে পজিটিভ বলে ধরা হবে। মজাই লাগলো। মানুষের মস্তিষ্ক পুরোটাই পাজল।

সন্ধ্যায় বৃষ্টি নেমে আসে, সেই সাথে মনে পড়ে, জমে থাকা কাজের পাহাড় আরও উঁচু হচ্ছে। মেইল এর রিপ্লাই দিতে হবে কিছু, কিছু মেইল চালাচালি শুরু করতে হবে নিজের থেকেই, মেইলের প্রস্তুতি হিসেবে জার্নাল পেপার এর লিস্টি বানাতে হবে - চাকুরির অনলাইন এন্ট্রিতে লেখার জন্যে একগাদা মিথ্যে সাজাতে হবে সুন্দর করে। এইসব জায়গায় আমার লিখতে ইচ্ছে করে - আমি আসলে খুব দুঃখবাদী মানুষ, আমার ঘুড়ি ওড়াতে ভাল্লাগে, আমি একা একা শঙ্খনীল নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখতে বসে থাকি অথবা আমি অনেক সময়ই অসুস্থ থাকি এবং আমি আপাদমস্তক আধাপাগল মানুষ । তা না লিখে রচনা করতে হয় নিজেকে বিক্রির জন্যে নিজের বানানো প্রশংসাপত্র। এইসব ভেবে আহে..ম - বলা ছাড়া কোন পথ দেখিনা।

এইভাবে, এইসব দ্বন্দ্ব আর দ্বিধার শেকলে নিজের আত্মার বাঁধা পড়া আর অনেক কষ্টে ভুলে থাকা আত্মজনের অসহায়তা মাখানো স্মৃতি নিয়ে এইসব দিন চলতেই থাকে। কোন কোন দিনশেষে বৃষ্টি নামে ঝরঝর। মধ্যরাতে যখন আমার ১২ মিটার স্কয়্যার এর ঠিকানায় ফেরার জন্যে পথে নামি, তখন ভিজে যাই কিংবা ভিজি না। সেইসব দিনে এইসব লিখতে ইচ্ছে করে।
তাই লিখে রাখি। সব্বার বিরক্তির উদ্রেক করেই।


সময়কাল : অক্টোবর ১৯ শুক্রবার এর দিন পেরিয়ে রাত দুটো মতোন
ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা : উইন্ডোশপার , সিসিএল এর আওতায় ব্যবহৃত

রবিবার, অক্টোবর ১৪, ২০০৭

পাঁক

মা কে মনে পড়ে আমার, মা কে মনে পড়ে। আমি মাঝেমাঝে একা জলকবিতা বুনি। আমি একটা আধা-পাগল স্মৃতিকাতর মানুষ।

১.
ছোটবেলায় আমি পাঁকে পড়ে গিয়েছিলাম। পদ্মায়।
সেইবার, যেবার অনেক পানি হয়েছিল নদীটায়, টি-বাঁধ বন্ধ করে দিয়ে দিনে রাতে বিডিআর এর গাড়ি টহল দিতো বাঁধের উপরে। ঠিক সেইবার, বৃষ্টির মৌসুম শেষে পানি নেমে যাওয়ার পর বেড়াতে গিয়ে। যতই উঠতে চাই কাদা ছেড়ে, ততই টেনে ধরে কে যেনো। অনেক কষ্টে চিৎকার দিই, অভিকর্ষ বলকে পরাহত করতে পারি না, পায়ের সাথে স্যান্ডেলের স্পর্শ খুঁজে পাই না।

মায়ের নরম মুখটা মনে পড়ে, আবার জোরে চিৎকার দিই, আল্লাকে ডাকি, স্কুলের ধর্ম শিক্ষা বই থেকে শেখা যতো দোআ মনে পড়ে, সব বলতে থাকি। দূরে লুঙ্গি মালকোচা মারা মানুষের বিন্দু বড় হতে থাকে, একটা অচেনা মানুষ এসে আমায় তোলে। ধমক-টমকও দিয়েছিল বোধহয়।

তারপরও আমি নদীটাকে ভালবাসতাম। সেই বছরেই পানি বেড়ে যাওয়ায়, টি আকৃতি বাঁধের মাথার অংশটুকু সেই যে বন্ধ করে দিলো, আর খুললোইনা কখনো।

২.
আমার মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষে প্রথম ট্রেন ভ্রমণের আবছা যে স্মৃতিটুকু সংরক্ষিত, তাকে আমি পুরনো ডায়রির পাতার মতো মাঝেমাঝে খুলে দেখি।
একটা অদ্ভূত দৃশ্য। একটা বাচ্চা, একজন নারী, একজন পুরুষ। আমি, আমার মা ও বাবা।
আমার মা প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর। বাচ্চার দিকে খেয়াল দেওয়ার সময় নেই তার। বছর চারেকের বাচ্চা মানুষটা বিহ্বল ও অবাক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ের এই চেহারা সে কখনো দেখেনি।
(বাচ্চাটি বড় হয়ে শুনেছিল, তার মায়ের অসুখ করেছিল ভীষণ, আর তাদের ভ্রমণ ছিল উত্তরের অজপাড়াগাঁ থেকে রংপুর নামের শহরে, চিকিৎসার জন্যে।)

তার পরের বছর সেই বাচ্চাটি হঠাৎ একদিন দেখে, তাদের বাড়ির সব জিনিষপত্র ট্রাকে তোলা হচ্ছে। গ্রামের মেয়েরা মায়ের হাত ধরে কান্নাকাটি করছে, শান্ত-শীতল মা সবাইকে বলছেন - তিনি আবার আসবেন। বাবা বাড়ি দেখাশোনার জন্যে মামাদের সাথে কথাবার্তায় ব্যস্ত। তারপর ধূলো উড়িয়ে সেই ট্রাকটায় চড়ে সবাই মিলে হাজির হই একটা মফস্বল শহরে।

পঞ্চগড়, না শহর না গ্রাম - একবারে ধূলো ওড়ানো মফস্বলে চেহারা। করতোয়া নদী চিরে গেছে যার বুক। অনেকবড় একটা বাড়ি, অনেক গাছপালা, আম কিংবা অন্যকিছু। একদঙ্গল ভাই-বোন, সবাইকে আগলে রাখে সেই মমতাভরা মুখ। ছয়জনের মাঝে একেবারে ছয়নম্বর - সেইজন্যেই বুঝি আমাদের গল্পের বাচ্চাটা বড্ড বেশি মা-ন্যাওটা। তারপরও বাবা জোর করে শীতমাখানো সকালে করতোয়া নদীর উপরে ব্রীজে নিয়ে যেতেন, হিমালয় দেখবার জন্যে। রাশভারী বাবার আঙুল জড়িয়ে ছোট বাচ্চাটি হিমালয় দেখার চেষ্টা করে - আর, ভোরে বাইরে গেলে, ভাঁপা পিঠা কিংবা খেজুর রস নিয়ে বাড়ি ফেরা তো আছেই।
কিন্তু, সবচেয়ে বেশি ভাল লাগতো বাবার খসখসে আঙুল জড়িয়ে নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে।

নদীর জন্যে ভালবাসা সেই থেকে শুরু।
পঞ্চগড়ের মফস্বলে থাকা হয়নি বেশিদিন। তারপর রংপুরে অল্প সময়। সবশেষে এসে পড়ি পদ্মা পাশ দিয়ে নেচে নেচে চলে যাওয়া এই শহরটায়। রাজশাহীতে। ততদিনে হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট পরে বাইরে বেরিয়ে পড়ার বয়স হয়ে গেছে সেই পিচ্চি ছেলেটার।

৩.
পদ্মার ধার ধরে আমি হাঁটতাম।
বুড়োদের মতো। উদ্যমী সকাল অথবা বিষন্ন সন্ধ্যা কাটে আমার ভালবাসার নদীকে ঘিরে। আমার সব দুঃখ মুছে যায় চিকচিকে চাঁদের আলো পড়া জলধারার দিকে তাকিয়ে থাকলে।
তিন-চারঘন্টা টানা বৃষ্টি হলে শহর ডুবে যেতো, আমি থপথপ করে শব্দ তুলে স্কুলের পথে হাঁটা ধরতাম, কাদা মেখে ভিজে ফিরতাম। মা বকতো না। সে শহর বদলে যায়, অনেক ড্রেন তৈরি হয় শহর জুড়ে। আর কাদা হয়না, পানিতে ডোবেনা। শহরে আরো অনেক কিছুই পাল্টায়।
কেবল আমার নদী পাল্টায় না, আমার ভালবাসাও নয়।

আমার মা ও নয়। মায়েরা বদলায় না কেন যেনো।
আমার মা আমাকে কখ্খনো বকে না। আমার মায়ের নরম মুখছবি আমি কঠিন হতে দেখিনা। ১৮ বছর বয়েসে যখন আমি স্বার্থপরের মতো দেশকে ঠেলে বিমানবন্দরের কাঁচের দরজার মুখে মেটাল ডিটেক্টরের বাধাটা পেরিয়ে আসি, তখনও দেখি কাঁচের ওপারে নরম মুখ, জল ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা তাঁর মাঝে। নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হতে থাকে।

৪.
এই গ্রীস্মের কোন এক সন্ধ্যার কথা। আমি ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে আমার বিদ্যাপীঠ থেকে বাসায় ফিরি ও ফোন তুলে নিয়ে প্রায় চারদিন পর নিজের আত্মজনের খোঁজ নেবার আপাত-ব্যর্থ চেষ্টা করি। নরম মুখচ্ছবির সেই কণ্ঠ শুনতে পাই ওপারে। আমার ক্লান্তি কেটে যায় অনেকটা, কিন্তু মনটা খচখচ করতে থাকে।

১৯ বছর আগের ট্রেনে সেই বাচ্চা মানুষের স্মৃতিকোষগুলোতে যে মুখছবি রাখা, ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠে শব্দের যে ছবি তার সাথে মেলেনা।
অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারি, আমার জনক ভালো নেই। আর এবারের আঘাতটা মস্তিষ্কে। শরীরে জেঁকে বসা হৃদরোগ আর ব্লাড সুগারের বিভ্রাট জনিত সমস্যাগুলো তো আগে থেকে আছেই । অপরাধবোধের অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরে। যে সময়ে আমার যেখানে থাকা উচিত, আমি সেই সময়ে সেখানে থাকতে পারিনা।

শান্ত জলধারার নদীর কান্না আমি শুনি। শুধু শুনেই যাই।
আমি এই পরবাসে সুখী মানুষ ও সুখের অভিনয় করে যাওয়া মানুষদের দেখে মুগ্ধ হই, নিজেও সুখের রেসিপি খুঁজি।
তাই আমার সময় হয়না নদীর ডাকে সাড়া দেবার, জননীর পাশে বসে থাকার। এই পাথুরে নগরে আমি খুব স্বাভাবিক নাগরিকের মতো একেকটা দিন পার করতে থাকি।
আমি অনুভব করি, সেই যে পাঁক - ছেলেবেলায় আমায় মুক্তি দিয়েছিল, ধীরেধীরে আমি নিজেই সে পাঁকে তলিয়ে গেছি, স্বেচ্ছায় আলিঙ্গন করেছি সেই পরিণতি।
শুকিয়ে গেছে আমার, ছেলেবেলার ভালবাসার নদী।

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭



এই লেখাটি লেখা হয়েছিলো অনলাইন রাইটার্স কমিউনিটি সচলায়তন এর ই-বুক ফেলে আসা ছেলেবেলা র জন্যে। অন্যদের দারুণ সব স্মৃতিচারণের মাঝে আমার এই না-ছেলেবেলা না-এইবেলা আঁকিবুঁকির চেষ্টা ধরনের লেখাটিও সমন্বয়ক আরিফ জেবতিক কেন যেন বইটিতে স্থান দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি।
ফেলে আসা ছেলেবেলা ই-বই টি পিডিএফ আকারে পাবেন এখানে

ছবি কৃতজ্ঞতা উপরের ছবি-ফ্লিকার, নিচের ছবি নিজস্ব

শুক্রবার, অক্টোবর ০৫, ২০০৭

"তফাত যাও, তফাত যাও! সব ঝুঁট হ্যায়, সব ঝুঁট হ্যায়।"

১.
আমার রাত কাটানো ছোট্ট ১২-১৩ স্কয়্যার মিটার এর ঘরে দুটো বাতি আছে, একটা রান্নার জায়গাটার দিকে আরেকটা একেবারে ঘরের ঠিক মাঝখানে।
অনেকদিন ঘরের মাঝের এই বাতিটা জ্বালাই না। রান্নার জায়গাটায় বাতিটা জ্বালিয়েই কাজ সারি। আসলে কারণ অবশ্য অন্য। আলো সহ্য করতে পারি না এখন আর।

পেঁচার মতো হয়ে গেছে স্বভাব। অনেক দেরিতে ঘুম থেকে উঠি। মাঝরাতে দৌড়ুতে বেরোই। ছেঁড়া নোংরা নদীটা হাতের ডানে রেখে উড়ে যাই থপ থপ শব্দ তুলে। সাইকেলে টহল দিতে বেরিয়ে পড়া পাড়াতো মামা পুলিশ বেচারির মাঝ রাতের ডিউটিতে দেখা হয়ে যায় অন্য সব দিনের মতো। চেহারা চেনা, কাজেই বিরক্ত করার কোন কারণ নেই। কিংবা শুঁড়িখানা থেকে টালমাটাল হয়ে ফিরতে থাকা কোন মানুষ, আমি দেখেও না দেখার ভান করি যেইগুলোকে। অহেতুক ঝামেলা এড়িয়ে দৌড়ুনোর গতি বাড়িয়ে তুলি।

চেনা পথ, এক ঘন্টা দৌড়ে আসি। ক্লান্ত হই - আবার ভালোও লাগে। মিশ্র অনুভূতি।
বাড়ি ফিরে ভাল লাগার অংশটুকু মাপতে বসি।
নাহ, ঘরের মাঝের ওই বড় গোল দুটো টিউব জ্বালানোর সাহস হয় না। অন্ধকারেই হাতরে রান্নার জায়গায় ওই বাতিটা খুঁজে বের করি। অথচ জানেন, বছর তিনেক আগে এই বাসাটায় আসার মাস দুয়েক পর আমি এই বাতিটার অস্তিত্ব আবিষ্কার করি। খেয়ালই করি নি অনেকদিন।

নিজের কাছে নিজেই কী যেন লুকোতে চাইছি আসলে। কী লুকোতে চাই - বুঝতে পারি না।
আজকাল গণকযন্ত্রের মুখোমুখি জীবনের ভাগ বেশ লম্বা হয়ে গেছে। যতক্ষণ জেগে থাকি, ৫০-৬০ ভাগ মনিটরের সামনে - খুব খারাপ অভ্যাস - জানি খুব ভালো করেই। বদলাতে চেষ্টা করি, পারি না। আগামী কয়েক মাস মনিটর দেখে পার করা দিন আর বাড়বে - দিন দিন কূপমণ্ডুক হতে থাকবো, গুছিয়ে কথা বলার ক্ষমতাটা কমে আসবে, টিপিক্যাল নার্ড এ পরিণত হওয়ার ধাপে আরো এগুতে থাকবো।

২.
নতুন সিমেস্টার শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ হলো, ক্রেডিট নিতে হবে আরো আট মতো। বেছে বেছে সন্ধ্যায় হবে এরকম তিনটে ক্লাস বাছাই করলাম। নাওকি ইনোসে, ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক, লেকচার - আধুনিক জাপানের ইতিহাস। স্কুলের টাকা বেশি হয়েছে - বুঝতে পারলাম - এরকম ফিগারকে ক্লাসে এনে হাজির করতে ট্যাকশো ভালোই যাচ্ছে নিশ্চয়ই। আহহারে, ভুল জায়গায় টাকা ঢালা হয়। আরেকটা ক্লাস নিলাম মনোরোগবিজ্ঞান ১০১ - সাইকিয়াট্রি। সেখানেও দেখি কোন এক বিখ্যাত মনোরোগ বিশারদ।
ইতিহাস, সমাজচিন্তা, রাজনীতি, ধর্ম, মনোবিজ্ঞান - এসব আমায় টানে কেনো যেনো। যন্ত্রপাতির পড়াশুনা ছেড়ে এগুলোর কোন একটাতে বদলিয়ে ফেলবো নিজের হাঁটাচলা - অনেকদিন ভেবেছি।
সে ভাবা পর্যন্তই।

এসব শুধু ভাবা পর্যন্তই। বাঙালি মধ্যবিত্তের বীজ শরীরে-মনে যার, সে এইসব ভাবনার বাস্তবায়ন করতে পারে না। সমাজচিন্তা করে পেটের ভাত জুটবেনা বলেই তো যন্ত্রবিজ্ঞান পড়ি, মানে পড়ার ভান করি। ডিগ্রির লোভে অভিনয় করে যাই প্রতিক্ষণ, প্রতি পল।
বাঙালি মধ্যবিত্ত ভুল পথে ভুল জীবন যাপন করতে থাকে, সে বাঁধা পড়ে পরিবারে, তার কাছে প্রত্যাশা করা যায় না কোন বিপ্লবের। তার ভাবনাগুলো মাথার রান্নাঘর থেকে বড়োজোর ডায়রির পাতায় আসে, খুব বেশি স্বপ্নবাজ হলে লিটল ম্যাগে যায়, দৈনিকের পাঠক ফোরামে আলোর মুখ দেখে। মধ্যবিত্ত বাঙালি আশি ভাগই ভুল সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয় - সমঝোতা করে কাটিয়ে দেয় বছর বিশ-ত্রিশেক, এইভাবেই টেঁসে যায় কোন একদিন।

৩.
এখন চব্বিশ-পঁচিশ, একটা সিম্যুলেশন করা গেলে ভাল হতো - বছর বিশেক পরে কোথায় কীভাবে থাকবো। বাঙালি মধ্যবিত্তের সিম্যুলেশন এনভায়রনমেন্ট তৈরি করে, সম্ভাব্য ইভেন্ট গুলো লিখে রান করে দেখা যেতে পারে। আচ্ছা, সিম্যুলেশনে কি আবেগজনিত আত্মহননের চেষ্টা অথবা পরিস্থিতিজনিত জীবন থেকে পলায়ন - এইসব ইভেন্টও রাখা উচিত হবে?

গত ছয় বছরে দুইবার আত্মহননের দুটো সূক্ষ্ম চেষ্টা চালিয়েছিলাম, বেশিদূর এগুতে পারিনি। আবেগের সাথে টানাটানিতে লজিক জিতে যাওয়ায় বেঁচে গেছি। সে গল্প শুনতে চাইলে বলতে পারবো না। তবে, কাগুজে ডায়রির পাতায় লেখা আছে । ছিঁড়ে বা পুড়ে ফেলবো বোধহয় কোনদিন।
সিম্যুলেশনটা ধোপে টিকবে না - মনে হচ্ছে।
এইসব জীবনে সিম্যুলেশন কাজ করে না।

এইসব জীবনে পেঁচারাই জিতে যায়।
এইসব জীবনে দেখিস একদিন আমরাও বলে শেষ করতে হয় নিজের বরাদ্দ সময়।
এইসব জীবনে বড় বাতিদের জ্বালিয়ে নিজের উপরে আলো ফেলার মতো সাহস হয় না কখনোই আর। তাই মেহের আলি র মতো ঘরের চারপাশে ঘুরতেই থাকি নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে আর চিৎকার দেই "তফাত যাও, তফাত যাও! সব ঝুঁট হ্যায়, সব ঝুঁট হ্যায়।"
----

ছবি নিজস্ব, সময়কাল- অক্টোবর ০৮, বাইরে ম্যাঁড়ম্যাঁড়ে বৃষ্টি, ঘরে আবদ্ধ

শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০০৭

ঘাসফড়িং, রোদফড়িং

গিয়েছিলাম কাজে। অল্পস্বল্প জাপানি বলতে পারি, সেইসূত্রে বাংলা-জাপানি অনুবাদ সহায়তা দেবার জন্যে।
কিন্তু আহহারে, আমার বলা বাংলার যা হাল, তাতে ফোনে মা শুনে মাঝে মাঝে বুঝতে পারেনা। আর তিন সপ্তার প্রশিক্ষণে আসা এই ভেতো বাঙালির দল তো পারলে সামনাসামনি হেসে দেয়।

জাপানি কর্তা ভাবেন, আমি নিশ্চয়ই তার বলা মজার কথার কোন মজার বাংলা করেছি, তাই সবাই হেসে ফেলছে। আসলে তো হাসে আমার ইতংবিতং বাংলা শুনে - এটা তাকে কে বুঝাতে যায়!

"ইন্টারপ্রেটার" শব্দটার বাংলাই ভুল গিয়েছিলাম। দেশের এক বন্ধুকে ইয়াহুতে জিজ্ঞেস করতেই বল্লো, ক্যান, "দোভাষী"? তো, আমি এই দুর্বল বাংলা আর মোটামুটি খুঁড়িয়ে চালানোর মতো পারা জাপানি জ্ঞান নিয়ে গিয়েছিলাম দোভাষী র কাজে।

বাঙালিদের সাথে "ইন্টাড়্যাকশনে" জাপানি কর্তাদের সাহায্য করা আমার কর্ম। এনারা যা বলেন, ওনাদের বুঝিয়ে উঠতে আমার ঘাম ছোটে, ওনারা যা বলেন, তা নিজে বুঝতেই আমার হৃদপিন্ড ব্যাপক আহত হয়। আমি পানি খাই, পানি খাই আর পানিই খেতে থাকি । তাও রোজার মাসে। দোভাষীর কাজ হওয়ার কথা ভাষার দেয়াল সরানো, সেইখানে আমার নিজেকেই দেয়াল মনে হতে থাকে। এপাশের কথা, ওপাশের কথা সবই আমি পর্যন্ত এসে থেমে যায়। ঘরের বাতাস ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে। আমি মনে মনে শয়তানি হাসি হেসে ফেলি, হিহি।

সেই কাজে যাওয়া পাহাড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ মিটার উচ্চতায় চারটে দিন থাকা আর নানানরকম ভজড়ঘ্যাঝোড়। ক্যামেরা সাথে ছিল। সেইখানেই ফড়িং দের সাথে দেখা। সেই পাহাড়েই, রোদমাখা আকাশ, শুকিয়ে যাওয়া আকাশিয়া-লার্চ গাছের ডালের বিষণ্ণ রঙ আর শরতে লাল সাজে সাজার প্রতীক্ষায় পুরো পাহাড়ের নিজেকে মেলে বসে থাকা।
এইভাবে প্রেমে পড়ে গেলাম পাহাড়ের। আবার যাবো, তবে আর কাজে নয়। এবার বেড়াতেই যাবো।
"নেমে আসে সন্ধ্যা""মনফড়িং""রোদফড়িং"
---
(পাদটীকা ১ : 'র' এর পরে 'য' ফলা দিলে য়্যুনিকোড ব্যাটা ভচকে যাবে, তাই হাঁটু পানির জলদস্যু হিমু ভায়ের দেখানো পথ মতো 'ড়' এর শরণাপন্ন হওয়া)

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০০৭

কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানকে যে কোন শর্ত ছাড়াই মুক্তি দেয়া হোক

আরিফুর রহমান নামের সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ পিচ্চি ছেলেটা এখন কোথায় কোন জয়েন্ট সেলের অন্ধকার কামরায় রাত কাটাচ্ছে, আমি জানিনা। আমার জানতে ইচ্ছে করছেনা বাচ্চা ছেলেটির পরিবারের অসহায়তার কথা । মোটামুটি ধারণা করতে পারছি সে বাস্তবতা।
শুধু জেনেছি, তাঁর জন্যে কোন আইনজীবী দেয়া সম্ভব হয়নি মহামান্য সরকারের পক্ষ থেকে।

চারদিন আগে, একটি বহুল প্রচলিত তুচ্ছ কৌতুক প্রকাশের জন্যে ফ্রিল্যান্স কার্টুনিস্টকে গ্রেফতার ও হুজুরদের পায়ে ধরে সম্পাদককে মাফ চাওয়ানোর মতো শাস্তি দেবার পর, আমাদের মহামান্যগণ কী ভাবছেন, জানতে ইচ্ছে করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ও তার প্রেক্ষিতে যে বিক্ষোভ হয় - তাকে "মুহম্মদ" ফকরুদ্দিন ও "মুহম্মদ" মইনুলেরা "অপশক্তি"র কাজ বলে উল্লেখ করেছিলেন। জঙ্গীবাদী সংগঠন হিজবুত তাহরীরের বিক্ষোভের পর তাঁদের সেই মহান শব্দচয়ন কোথায় গেলো? এঁরা তাহলে কি "অপশক্তি" নয়?
নাকি, এই জঙ্গীরা সরকারের "উপশক্তি"?
আমার ভয় হচ্ছে।

আপনার রেমিট্যান্সের হাজার টাকা, কিংবা আমার ট্যাক্সের একটাকা-দুইটাকায় পরিচালিত সরকারের সামান্য একজন বেতনভোগী কর্মচারী খতিব ওবায়দুল হক যখন আয়েশি ভঙ্গিতে মইনুল, মতিউর-১, মতিউর-২ দের নিয়ে তওবা ও কবুল ধরনের বৈঠকে বসেন, তখন আমার ইচ্ছে করে, থুথু নিক্ষেপ করি সেই স্থিরচিত্রে।

মহামান্য সরকার বাহাদুরে থাকা জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ (মইনুল বাদে), যারা চোখ বন্ধ করে আছেন - এবার চোখ খোলেন।
সাপেরা তাদের ডিমে তা দিচ্ছে। ডিম ফুটে বেরুনো বাচ্চারা আরো ভয়ংকর হবে - এটা বলাই বাহুল্য। আপনারা আগামী দিনগুলোতে কী করবেন, তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। আপনারা ক্ষমতা ও মসনদ লুটেপুটে খেয়ে নিন, অসুবিধা নেই। মতিউর ও ওবায়দুল এর বিয়ে পড়ানো হোক, আর হিল্লা করানো হোক - তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ইতিহাস আপনাদের কোন আবর্জনার বাক্সে নিক্ষেপ করবে, আমি বলতে পারছি না।
আমার ও আমার আত্মজনের পিঠে লাথি না মারলেই হলো, আমার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার চেষ্টা না করলেই হলো।

আপাতত, কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমান কে যে কোন শর্ত ছাড়াই মুক্তি দেয়া হোক, দিতে হবে।

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০০৭

কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না।

আরিফ জেবতিক এর লেখা :
"গ্রেফতার আরিফ,চাকুরিচ্যুত সুমন্ত আসলাম,আর শেষ রাতে মতি ভাইয়ের বিড়াল মারা।"

কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না!
কথা খুঁজে পাচ্ছি না।
হতাশাব্যঞ্জক এই সময়, এই দেশ আর ধিক্কার আমার নিজের জন্মের প্রতি কারণ আমি খুব ভুল সময়ে এসে পড়েছি!

প্রভূ, আমায় ক্ষমা করো। আমার অনুভূতি এতো ঠুনকো নয়!
আমি একদল বোধহীন শূয়রের পালের মাঝে আছি, যাদের ধর্মানুভূতি নামের নিরর্থক অনুভবটি এতোই সংকটে যে, তাদের দিনের পুরোভাগ কাটে নিজের বিশ্বাস আর লিঙ্গ ঠিক আছে কিনা, সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষায়।

ধিক্কার এই ধর্মোন্মাদ পতঙ্গগুলোর জন্যে।
বাকহীন ঘৃণা এই সরকারের প্রতি, এই নোংরা কীটগুলোর প্রতি।

------
সরকারের কৌতুক দেখে নিয়েন। সরকারি প্রেসনোট থেকে নেয়া।
হাঁটুতে বুদ্ধি থাকলে এইরকমই হয়।

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০০৭

মৃত মাছের গন্ধমাখানো দিনে

:: না, এই পোস্টে কোন জটিলতা নাই। সহজ কথায় লিখে রাখতে ইচ্ছে করছে একটা দিনের সবকিছু, আগে যেরকম লিখতাম। ::

মন খারাপ ভীষণ, শারীরিক অবস্থাও সেরকম। ঘুম থেকে উঠেছি অনেক সকালে, মেঘেদের আঁধার আর বৃষ্টিতে মাখামাখি আকাশ ও মাটি, তার মাঝেই বের হই বাসা থেকে।

১০টা থেকে পার্টটাইম ছিলো। সময় মেকআপ দিতে গিয়ে সাইকেল নিয়ে ভার্সিটির পাশের রেল স্টেশন পর্যন্ত গিয়ে ট্রেন ধরি, ট্রেনের বৃষ্টি-ঘোলাটে কাঁচে নিজের চেহারা দেখে নিজেই চমকে উঠি। এ আমি নই - মনে হতে থাকে। ভিজে ভিজে হাজির হই পার্টটাইমে - ওরাকল ডেভেলপমেন্ট সার্ভার তৈরি করে দিতে হবে - সেই কাজ - কনটেন্টস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের সেটআপ বাগে আনতে পারি না - এই করেই চারটে বেজে যায়।

ল্যাবে ফিরি, ল্যাব নেটওয়ার্ক এর ম্যানেজমেন্ট নিয়ে দেখি দুজন পিএইচডি ক্যান্ডিডেট নিজেদের মাঝে তুমুল তর্কে ব্যস্ত। মেজাজ অনেকদিন পর খারাপ হয়, আর যাইহোক - এরকম একটা দিনে এই দুইজনের গুঁতোগুঁতিতে দুইটারেই চড় লাগাইতে ইচ্ছা করে। পারি না। বাধ্য জুনিয়রের মতো চুপ করে শুনে যাই। এইসব নীতিনির্ধারকরা ঝগড়া করে, করুক - আমার কাজকর্ম না বাড়লেই হয়।

নিজের পড়াশোনা করার জন্যে ডেস্কে এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করি। হয় না, কিছুতেই কিছু হয় না।
ডেস্কে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি, জাগি, খিদে মেটানোর জন্যে কিছু খাবার-দাবার কিনে আনি। মুকেশ এর পুরনো গান শুনে অনুভূতিগুলো ধুয়ে ফেলার চেষ্টা দেই। ডম ডম ডিগা ডিগা মৌসুম ভিগা ভিগা.. বৃষ্টিতে ভিজে রাজকাপুরের অসাধারণ অভিনয়। তারপরো হয় না, কিছুতেই কিছু হয় না। স্থবির পৃথিবী আর সচল হয় না।

বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করে। বাইরে ঠান্ডা। দেশে ফোন করা দরকার, কিন্তু করতে ইচ্ছে করছে না। কাল নাকি আবার রোজা শুরু, মাথা থেকে আপাতত সেই ব্যাপারটা দূরে রাখি।
শিনজো আবে হঠাৎ পদত্যাগ করেছেন। অবাক হই। টিভিতে সেই খবরে ভর্তি। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, রুপোর চামচ মুখে নিয়ে বেড়ে ওঠা জাপানী প্রধানমন্ত্রী, স্ট্রেস সহ্য করতে পারেননি দায়িত্বের। কেউ সুখে নেই!

এইভাবে একটা দিন শেষ হয়, সারাটা দিনের সঙ্গী হয়ে থাকে মরা মাছের আঁশটে গন্ধ মাখানো অনুভূতিরা। মনে হতে থাকে, এই আমি আমি নই।

----
ডম ডম ডিগা ডিগা"
গান: মুকেশ
"চালিয়া" ছবিতে গাওয়া গান। ইউটিউব থেকে গানটা ক্যাপচার করা।
রাজকাপুরের অসাধারণ অভিনয়ের ভিডিও এখানে , ইউটিউব লিংক

বুধবার, আগস্ট ২৯, ২০০৭

পোড়া সময়ের অক্ষরমালা

ছোটবেলায় গোল ডায়াল ঘুরিয়ে করতাম যে ফোন, তা এখন হয়ে গেছে ব্যক্তি পরিচয়ের অংশ। না থাকলেই নয় একটা নম্বর - কারো আবার দুটো, তিনটে। দেশে ফেলে আসা বন্ধুদের একেকজনের নম্বরের কালেকশন।
সেই যে ইয়াহু দিয়ে শুরু করেছিলাম প্রথম একটা মেইল অ্যাড্রেস খোলা, তা এসে স্থায়ীভাবে ঠেকেছে গুগল মেইলে মানে জিমেইলে - আছে নিজস্ব ডোমেইনও একটা।

বাংলায় দুটো লাইন লিখে কোন এক পুরনো শুভাকাঙ্খীকে পড়তে বলে কয়েকবার ঝাড়ি খেতে হয়েছিল এনকোডিং আর ডিকোডিং সমস্যা নিয়ে।
আর এখন অভ্যস্ত আঙুলে ভালবাসা বুনে চলি বাংলা অক্ষরে।

ডিজিটাল হয়ে গেছে ভালবাসা, বন্ধুত্ব, আর আমাদের মনন।
মুখোশ পড়ে দিন-তারিখ ধরেবেঁধে এখন আমরা বন্ধুস্মরণ দিবসে বলে উঠি, বন্ধু, কেমন আছিস , কিংবা বাবাদিবসে, আয়্যাম মিসিং য়্যু, ড্যাড!
আমরা বদলে গেছি আমাদের পৃথিবীসহ। বেনিয়া আর কর্পোরেট, টেলি কম্যুনিকেশন সার্ভিস প্রোভাইডারদের তৈরি করা চাকুরির বাজারে আমরা আমাদের স্মার্টনেসের বিনিময়ে ক্যারিয়ার কিনি। কিনি ভবিষ্যত। বিকিয়ে দেই ঘাসফুল আর নদীর জন্যে আমাদের ভালবাসা।


কিন্তু, আমি অবশেষে বদলেছি কি? কৈশোরের আমি বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে খাটের নীচে, লুকিয়ে ফেলা নিজেকে অপ্রিয় সব বাস্তব কষ্ট থেকে। খরগোশের মতোন।

আজ, বয়েস যখন দুই যুগ পেরিয়ে গেছে? এই অসময়ে, যখন লুকোতে পারিনা।


কৈশোরের দিনলিপির পাতায় যে নিঃসঙ্গ আত্মকথন, প্লাজমা, এলসিডি অথবা সিআরটি টিউবের স্ক্রীনে দেখানো যুক্ত ও অযুক্ত অক্ষরমালার এই জায়গাটুকুতেও পাল্টায়নি লেখার সে ধরন। অন্ধকার পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসা হয় নি আমার।
আমি অচল ও সেকেলে মানুষ অচলই থেকে গেছি।

কৈশোরে বুনে রাখা আত্মধ্বংসের বীজ ডানা মেলে হয়ে গেছে বটগাছ-সম। সময় বদলেছে, বদলে গেছে সবকিছু।
কিন্তু এখনো একেকটা দিন মানে কষ্টের খাতায় আরেকটা পাতা। জীবন মানে, পুড়ে যাওয়া মন আর কষ্ট চাপা দিয়ে দাঁত বের করে সব কিছু এনজয় করছি ভাব এনে বুদ্ধিদীপ্ত হাসি মুখে ধরে রাখা। জীবনের মানে, অচল মানুষের চামড়ার উপরে নেকটাই-স্যুটের মুখোশ জড়িয়ে নিজেকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরা কর্পোরেট চাকুরির বাজারে।

জীবন মানে সংসারী মানুষ হওয়ার বাসনা নিয়ে নানান সমঝোতা করে চলা প্রতি মুহূর্ত, সারাজীবন সমাজবদলের গান গেয়ে সবশেষে বেনিয়া কোম্পানিতে কেরানি হওয়া, ঘরের ঝড় কোনওভাবে চাপা দিয়ে লোকের চোখে সুখী দম্পতির অভিনয় করে যাওয়া। অথবা পালিশ করা ব্লেজার বা স্যুট গায়ে পরবাসে বেড়াতে আসা নোবেল ইউনুসের সাথে ছবি তোলার জন্যে হুড়োহুড়ি?

জীবনের মানে কি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে রুটি, কলা, কর্ন ফ্লেক, বাচ্চার দুধ, ফার্মেসি থেকে নিরাপত্তা - কিনে বাড়ি ফেরা অথবা বিষ্যুতবারের রাতে বন্ধুদের সাথে কয়েক পেগ গিলে বাড়িতে ফিরে বউয়ের বকুনি। এই তাহলে জীবন?

সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি, যে কিনা সাতপাঁচ না ভেবে জীবনের বড্ড অসময়ে গত সপ্তায় নিজের ভালবাসার মানুষটির সাথে অনানুষ্ঠানিক সাতপাঁকের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, তাকে আমি অভিনন্দনের মেইলে লিখি "আমি কোন স্বপ্ন দেখি না এখন আর। "
আত্মজনের কষ্ট, নিজের পোড়া পৃথিবী আর অস্মার্ট নিজেকে নিয়ে সভ্যভব্য সমাজে স্যুট-টাই পরে সভ্য প্রমাণ করে যাওয়ার যে অসফল চেষ্টা, সেইখানে অসময়ে পুড়ে যাওয়া মনকে চাপা দেয়া হয় না আমার।

আত্মধ্বংসের বটগাছটা ডাকতে থাকে মুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে।
প্রতিনিয়তই।
উপেক্ষা করতে পারবো না বোধহয় সে ডাক।


--
অন্ধকার ভরা হলেও এই পোস্টটি সেই বন্ধু ও তাঁর বালিকাকে উৎসর্গ।
কষ্টকর অনেকটা পথ বাকি এখনো তোদের দুজনের - জানি।
তোদের জীবন সুন্দর হোক রে, সুমি ও দীপ।
ছবি কৃতজ্ঞতা : ফ্লিকার লিংক

রবিবার, আগস্ট ২৬, ২০০৭

"শাসকের প্রতি" - জয় গোস্বামীর কবিতা

শাসকের প্রতি
জয় গোস্বামী

আপনি যা বলবেন
আমি ঠি-ক তাই করবো
তাই খাবো
তাই পরবো
তা-ই গায়ে মেখে ব্যাড়াতে যাবো
আমার জমি ছেড়ে দিয়ে চলে যাবো
কথাটি না বলে।
বললে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকবো সারারাত
তাই থাকবো।

পরদিন যখন, বলবেন
"এবার নেমে এসো"
তখন কিন্তু লোক লাগবে আমাকে নামাতে
একা একা নামতে পারবো না।
ওটুকু পারিনি বলে
অপরাধ নেবেন না যেন।

----------------
ওপার বাংলায় নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর ২০০৬ ডিসেম্বরের পটভূমিতে প্রিয় কবি জয় গোস্বামী র লেখা।
কবির আবৃত্তি অডিও থেকে কপি করতে কোথাও ভুল হতে পারে।
এপারের সামরিক মাথামোটা শাসকদের জন্যেও এই মেসেজটুকু জরুরি বলে মনে করছি।
তাই তুলে রাখলাম এইখানে।

শনিবার, আগস্ট ২৫, ২০০৭

এ আমার দেশ নয়

বিবিসি বাংলা শুনছি এই মুহূর্তে, শনিবারের সকাল। বিবিসি ছাড়া গতি নেই।
মধ্যরাতে কলিংবেল, সম্মানিত বিদ্যাগুরুগণ যান মূর্খদের সাথে - মূর্খ সেনাদের সাথে।
সাইদুর রহমান খান, মলয় কুমার ভৌমিকদেরও মধ্যরাতে যেতে হয় প্রশ্নের উত্তর দিতে। আমি অসহায়বোধ করি।

গত কয়েকদিনে সাংবাদিকদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিডিনিউজ এর বিপ্লব রহমান লিখছেন সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা। পড়ে কেঁদে ফেললাম। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেনা এইসব।
এ আমার দেশ নয়। এই সেনারা আমার ভাই নয়।

একটু পিছনে ফিরি।
ব্লগার ও সাংবাদিক তাসনিম খলিল গত কয়েক মাস আগে ২৪ ঘন্টা কাটিয়ে এসেছেন যৌথ বাহিনীর আতিথেয়তায়, তিনি বলছেন, যৌথ বাহিনী এখন টেকি - তাদেরকে আপনার জিমেইল আইডি-পাসওয়ার্ড দিতে হবে, তারা ইনবক্সে-আউটবক্সে অ্যাকসেস করবেন, সেলফোনে ইনকামিং-আউটগোয়িং নম্বরের লিস্টি দেখবেন।
আপনি ভার্চুয়ালি কার বা কাদের সাথে উঠেন-বসেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র (!) করেন - তারা সেইসব তথ্য চাইবেন। এমনটাই বলছেন নিজস্ব চেষ্টায় দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচা তাসনিম খলিল। তাঁর সহধর্মিণী এক মাস আগে তাসনিমের সাথে মেইল যোগাযোগ ছিল এমন মানুষদের এভাবেই সতর্ক করে দিয়েছেন এক গ্রুপমেইলের মাধ্যমে।

সকালের প্রথম আলো 'র অনলাইন ভার্সন, ছুটির দিনে প্রাণচঞ্চল বিভাগীয় শহর। খবরের আশাবাদী ভাষা আমার মুখে মতি ও আনামের এই জলপাই-পৃষ্ঠপোষকতার জন্যে একদলা থুথু এনে দেয়। সংগ্রাম এর মতো অশ্লীল পত্রিকার সাথে এইসব চাটুকারদের কোন পার্থক্য এখন এই মুহূর্তে নেই।

সোমবার থেকে শুক্রবার - নিজস্ব ব্যক্তিগত কারণে খুব সামান্য সুযোগ পেয়েছি দেশের খবর নেবার।
প্রায় অন্ধকারে আছি - কী হচ্ছে স্বভূমিতে? আমরা পাকিস্তানের মতো কোন ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগুচ্ছি? কী সেই মোটিভেশন সেনা-শাসকদের এইসব সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে?
নিম্নবিত্ত দিনে-আনে দিনে-খায় মানুষ কোথথেকে নিজের স্বজন ও পরিবারের মুখে খাবার দেবে এইসব জরুরি ব্যবস্থায়?

গত কয়েকদিনে আত্মজনের খবরও নেয়া হয়নি - তারাই বা কেমন আছে - কে জানে!
আমি খুব ক্ষুদ্র মানুষ - আত্মজনেরা ভালো থাকলেই আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ।

রবিবার, আগস্ট ১২, ২০০৭

বৃষ্টি ও মেঘহীন শূন্যতার প্রলাপ

এইরকম মাঝেমাঝেই এসে পড়ি এই নদীর পারে। এইরকম মানে, যখন নিজের সাথে নিজেই পেরে উঠি না।
কান থেকে গান খুলে রাখি পকেটে।
আইপড এর সবচেয়ে ছোট বাচ্চা ভার্সনটা - ন্যানো নয়, ন্যানোরও বাচ্চা শাফল্
হাতে যথেষ্ট টাকা ছিলো না এরকম সময়ে কিনেছিলাম। এখন আর ইচ্ছেটা নেই ন্যানো কিংবা মা আইপডকে কেনার, তাই কেনা হয় না। ক্ষুদে বাচ্চা টাই পকেটে পুরে আর কানে যোগ করে চলি।
পিছনে লিখে নিয়েছিলাম প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত এর লাইন - তোমায় নতুন করে পাবো বলে

আজকাল শুনি হ্যায়লি ওয়েস্টেনরা (») আর জোয়ান বায়েজ
মাঝেমধ্যে নচিকেতা।

সঞ্চয়ে ছিল সেই ফেলে আসা
ভাবনার জোছনায় ঘোর অমানিশা।
সঞ্চয়ে ছিল সেই ছেলেবেলা, মনে নীল রঙের নেশা কোন ঘন মেঘের ভেলা।
...
সঞ্চয়ে ছিলো কতো অভিমান, হারিয়ে যাওয়া গান, পুরনো সম্মান।
এসময় - অসময়, ফুরালো সঞ্চয়।


কিংবা
...
হাজার মানুষের ভীড়ে মিশে ......
ভোরের কোলাহল ঘুমের শেষে, দুচোখ আজো খুঁজে ফেরে
ফেলে আসা ছেলেবেলা।


মানুষের ভীড়ে থেকেও মানুষ খুঁজে ফেরা। একা একা পথ চলা, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে - মালয় সাগরে।
আশার নিঃস্বতায় স্মৃতিজাগানিয়া শৈশব এসে নিয়ে যায় মেঘভ্রমণে।

সন্ধ্যা নয়, অলস ও মন খারাপ করা বিকেল - সপ্তাহশেষের ছুটির দিনের। সারাদিনে গরম অনেক, পারদ উঠে গেছে ৩৫ এর উপরে, সেলসিয়াস স্কেলে। আমার এই স্কেল ব্যাপারটা বড়ই গোলমেলে ঠেকে মাঝেমধ্যে, জ্বর হলে একরকম আর গরম মাপায় আরেকরকম। অনেকদিন জ্বর-জারি হয় না অবশ্য।

নদীর ধারের বেসবল খেলার জায়গাটায় গরমের ছুটিতে প্র্যাকটিস সেশন হাইস্কুল কিশোরদের, ছুটিশেষের জাতীয় ইভেন্টের প্রস্তুতি বোধহয়। কতো স্বপ্ন - ঈর্ষা হয়!
চোখ বন্ধ করে হেঁটে চলা জীবনে স্বপ্ন না থাকার ঈর্ষা।
কিশোরী ও বাবা - দুজনে দুটো দ্বিচক্রযানে, গল্প করতে করতে চলে যাওয়া পাশ কাটিয়ে।
আমিও একটা চক্রযানে। হালকা গতি, নিঃশব্দ চলা। দূরে, প্রিয় পোষা প্রাণীদের নিয়ে ফ্রিজবি খেলায় কোন দম্পতি। অথবা, বারবিকিউতে একটা দল - পোড়া গন্ধ ও ধোঁয়া। বিয়ারের ক্যান ছড়ানো এদিক ওদিক।

এইসব বিচ্ছিরি বাস্তবতার মাঝেও পোড়ে মন।
স্মৃতিদের মুছে ফেলা যেত যদি কোনওভাবে - অনেক দিন ভেবেছি।
আজও ভাবি আর কষ্ট পাই।
সেই কষ্টে তাই কিছু লেখা হয় না, লিখতে পারি না এখন আর।
এখন শুধু দৌড়ুই, দৌড়ুতে থাকি এই মরা নদীটার ধার ঘেঁষে, টেনে ধরতে না পারা মনকে কোথাও থিতু হওয়ার সুযোগ দেই না, সুযোগ দিলেই সে পুরনো রং এর ঝাঁপি খুলে বর্তমানের পটে বৃষ্টি আর মেঘ আঁকতে বসবে।

তাই, দৌড়ুতেই থাকি সময়ের কাছে হেরে যাবার আগে।


লেখা: আগস্ট ১২, ২০০৭
সচলায়তনেও প্রকাশিত
---
ছবি : নিজস্ব, আগস্ট ১২, ০৭ এ তোলা
সময়-অসময় : নচিকেতার গান

রবিবার, আগস্ট ০৫, ২০০৭

"পরাণো কান্দে তোরো লাগিয়া"

বুড়ো হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন।
একেকটা মুখ এসে স্মৃতির দরজায় টোকা মারে।

উপমা নামের মেয়েটা আমার সাথে পড়তো, সেই ছোটবেলায়, ক্লাস ওয়ান-টু, নামটা মাথায় ঢুকে পড়ে আছে। আমি ফার্স্ট হবো, না সে - এরকম একটা প্রতিযোগিতা ছিলো বোধহয়।
কিংবা জিমি, যার সাথে একবার চিনিকলের গাড়ির পেছনে ঝুলে পড়ে আখ চুরি করে খেয়েছিলাম। হাফপ্যান্ট বয়েসের কথা, অজ-মফস্বল শহর পট হয়ে আছে যে ছবিতে। করতোয়া নদী চিরে গেছে যার বুক।
আমার জনকের ছিলো ব্যাংকের চাকুরি, ঘুরপাক খেতাম উত্তরের মফস্বলে।

উপমার বাবার প্রশাসনে বদলির চাকুরি ছিলো, তারপর উপমাকে খুঁজেছিলাম বড় হয়েও, যদি কোথাও দেখা হয়ে যায়, আরে! তুই সেই পিচ্চিটা নাহ? টাইপের আবিষ্কারের আশায়।

যেমনটা দেখা হয়ে গিয়েছিলো ফয়সলের সাথে, ক্লাস থ্রিতে ছেড়ে আসা কিন্ডারগার্টেনের ফয়সল - দেখা হলো আহসানউল্লাহর সামনে হঠাৎ একদিন, যন্ত্রপাতির ভার্সিটিটায় ভর্তি হতে এসে। মাঝে অবশ্য ১০-১১ বছর। আরে, তুই তো সাইজে বাড়িসনি - চিৎকার্ করে ওঠা, নতুন ধরনের দেখা হয়ে যাওয়া।
কিংবা অনির্বাণ, সেই বিশালদেহী বন্ধুটা, যার নিষিদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার ছিলো আমাদের কিশোর বয়সের বিস্ময়, ক্লাস সিক্সে চলে গেলো ইন্ডিয়ায় - ইঁচড়েপাকা, আমাদের সাথে পড়ার জন্যে একটু বেশি বয়েস ছিলোই বোধহয়। অনির্বাণ, আবার যদি দেখা হতো তোর সাথে রে!
অথবা ইমন, কতোদিন পরে তোকে খুঁজে পেলাম, চলে গেছিস সুইডেনে, পৃথিবীর অন্ধকার অংশে থাকিস - ২ ঘন্টা সূর্যের আলোর দিনও পার করিস নাকি- একদিন বলেছিলি। গুগল টকে তোকে দেখি মাঝেমধ্যে - নক করার সাহস হয় না কেন যেনো!

স্বপনটার সাথে তো আর দেখাই হলো না। ওর সাইকেলের ক্যারিয়ারটা বরাদ্দ ছিলো আমার জন্যে। দূরত্ব বাড়ার শুরু কলেজ থেকেই - তারপর ছিটকে পড়া।

সব মুখ একসাথে ঘুরপাক খায় এই রজত জয়ন্তী পার করে আসা জীবনটায়। সব প্রতারক আর ভন্ড।
এই লগ্নে হারানো সূচি, যে ছেড়ে যায় এই কাটখোট্টা জীবনের দুঃস্বপ্নদের মাঝে আমাকে একা ফেলে রেখে, সবকিছু পায়ের নিচে ফেলে। স্বার্থপর!

কেউ কথা দিয়ে কথা রাখেনা।
কেউ নাহ। আমার অভিমানের আকাশটা বড় হতেই থাকে। আবার দেখা হবে - কথাটাও মিথ্যে। দেখা হয় না কারো সাথে।
আমি অপার হয়ে বসে থাকি তোদের জন্যে। ইচ্ছে হয়, চিৎকার করে বলি - তোরা কেউ কথা রাখিস নি।

রিনরিন বেজে যায় কান্না আমার ছিঁচকাঁদুনে হৃদয়ের কোণে।
"বন্ধুয়ারে, পরাণ যে কান্দে তোরো লাগিয়া!"
আবার যদি দেখা হতো তোদের সাথে রে।

-----
রোববার, আগস্ট ৫, ২০০৭

শনিবার, আগস্ট ০৪, ২০০৭

কষ্ট মুছে ফেলা কণ্ঠ - "Hayley Westenra"

কদিন আগে বিক্ষিপ্ত মনে য়্যুটিউব ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে ভালো লেগে গেলো হ্যায়লি ওয়েস্টেনরা । সেই থেকে শুনছি আর মুগ্ধ হয়ে আছি।
এক কথায় ডুবে আছি নিউজিল্যান্ডার এই সুকন্ঠী সপরানো র সুরে।
অভিমান আর কষ্ট মুছে ফেলা সুর আর কথা।
এই পোস্ট ছেড়ে যাবার আগে শুনে নিন তাঁর প্রথম অ্যালবাম থেকে নেয়া এই গানটি - "Beat of your heart".
এই গানের লিরিক পেতে এখানে ক্লিক করুন অথবা নিচের "পুরো পোস্ট পড়ুন" লিংকে গুঁতো দিন। হ্যায়লে ওয়েস্টেনরা র গানের লিংক : য়্যুটিউব অথবা ইস্নিপস
"Beat of your heart" - Hayley Westenra



এই গানের লিরিক ।


সোমবার, জুলাই ৩০, ২০০৭

আমি বৃষ্টি ভালবাসি না!

আমি বৃষ্টি পছন্দ করি না।
বৃষ্টিদের আমি পছন্দ করি না। ঝুমঝুম বাচ্চা বৃষ্টি, নরম ঝরঝর ঝরে যাওয়া মা বৃষ্টি আর কটকটে বাজ পড়তে থাকা বাবা বৃষ্টি।

তারা আমাকে আমার শৈশবের পুরনো শহরের কথা মনে করিয়ে দেয়। ধোঁয়াটে সকালে ছাতা এক হাতে নিয়ে ফোনিক্স বা ফিনিক্স সাইকেলে চড়ে ছুটে যাওয়া বালকটির কথা মনে করিয়ে দেয়।
ভিজে যাওয়া স্কুলের য়্যুনিফর্মের ফতুয়া, নষ্ট যাওয়ার ভয়ে হাতে নেয়া বাটার কালো জুতো আর কাদা মাখানো খাকি প্যান্ট - সব মনে করিয়ে দেয়। বাড়িতে ফিরে সেই ফতুয়াটা ধুয়ে আবার শুকোতে দিতে হবে পরের দিনের জন্যে- জেনেও কোন ভাবান্তর হয় না সেই বালকটির। ভাবার মতো বয়স নয় যে সেটা।

কসাইরা ঝিম মেরে থাকে, বিক্রি ভালো হয় না; বেওয়ারিশ আহত কুকুরগুলোরও মন খারাপ, আজ কিছু মিলবেনা বোধহয়। আমি কাদা মেখে বাড়ি ফিরি তার পাশ দিয়ে। পচা লাউ, পোকায় খাওয়া আলু এদিক ওদিক ছিটিয়ে পড়ে থাকে কাঁচাবাজারটায়।
বাড়িতে ফিরি, বাড়িতে ফিরলে আমার মন আরো খারাপ হয়। তাই আজও বর্ষায় আমার মন খারাপের ভয় করে।


আমি আজও এক হাতে একটা সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরি, অ্যামেরিকান ঈগল স্পোর্টস বাইসাইকেল। শৈশবে যেরকম একটা বস্তু স্বপ্ন ছিলো অনেকটা সময়।

মাঝরাতে আরেক হাতে থাকে ছাতা। মাঝপথে এসে ছাতাটা গুটিয়ে ফেলি। ইচ্ছে করে ঠাণ্ডা বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করে যাই আমি। আমার মনে হতে থাকে, আমি বৃষ্টি ভালবাসি । আমার বোধ হয়, বৃষ্টি একই সাথে প্রিয় ও অপ্রিয় আমার কাছে। সারাদিন আমার মন খারাপ থাকে নানানকারণে, তবুও। আমি আসলে ঠিক করতে পারিনা, বৃষ্টিকে আমার, পছন্দ না অপছন্দ কোন তালিকায় ফেলতে হবে।

আমি জানি, এইসব দ্বিমাত্রিক দ্বন্দ্বেরা আমাকে কুরে কুরে খাবে আমার বাকি সংক্ষিপ্ত জীবনটুকুও।

----------
ছবি কৃতজ্ঞতা : ফ্লিকার

শনিবার, জুলাই ২৮, ২০০৭

ভোট চাই, দিতে হবে!

একখান ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। ডান পাশের সাইড বারে আছে।
এই জায়গায় যারা পদধূলি দেন, অনুগ্রহ পূর্বক একখান ভোট দিয়া যাবেন।
লবণ লবণ ধন্যবাদ আগেভাগে।

--
বিবর্ণ আকাশ এবং আমি .... র লেখারু

শুক্রবার, জুলাই ২৭, ২০০৭

এইসব দিনরাত্রি - ৪

অতঃপর, অধম সিদ্ধান্ত নিলো, মানে মানে - নিতে বাধ্য হলো।
তত্তোদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, ঘর হয়ে গেছে মরা ইঁদুরের গন্ধময় আর দিনযাপন হয়ে গেছে অক্ষছেঁড়া নামের মরা পচা নদীর মতো। সেইখান থেকে ফেরত আসা যায় না, মানে মানে, কেউ ফেরত আসতে চাইলে সে নাকি মারা পড়ে আর তাকে নতুনভাবে ধারাপাত শিখতে হয়।

কিন্তু কেমন করে য্যানো অধম ধারাপাত না শিখেই মুক্তি পেলো, আর ভাবতে লাগলো, পিথীমিটা যা মজার নাহ! আর সে বিশ্বাস করতে লাগলো, ঈশ্বরই তাকে উদ্ধার করেছে। তাই তার জীবন হয়ে উঠলো ঈশ্বরময়!
নতুন জন্মের পর, মরা ইঁদুর টাকে খুঁজে খুঁজে বেড়াতে লাগলো সারাঘর জুড়ে।

অবশ্য, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, সে সৌভাগ্য তার হয় নাই। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত মরা ইঁদুরের সাথে সহ-বাস?
তাই, মাথা ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে চুলকাতে চুলকাতে সে ঘর ছেড়ে বেড়াতে গ্যাছে পচা নদীর উৎসমুখ খুঁজতে। তবে, সে নাকি বিশ্বাস হারায়া ফেলছে জগতের মনু সম্প্রদায়ের উপর। এখন সে কী করবে, জানার জন্যে আপনাদের অপেক্ষা করতে হবে এই গাঁজা সিরিজের পরবর্তী সিকুয়েল পর্যন্ত।

------------------
যথারীতি ডিসক্লেইমার:
"এইসব দিনরাত্রি" র ব্যাপারস্যাপার গুলো জাস্ট কিছু দৈনন্দিন খসড়া ,ইচ্ছে করেই দুর্বোধ্য করে তোলা।খুব একটা মনোযোগ দিয়ে না পড়ার অনুরোধ করি।

বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৬, ২০০৭

দ্বীপদেশের চিঠি-১: গণতন্ত্র

সতর্কতা : এটি একটি দীর্ঘ, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ধরনের বক্তব্য সম্বলিত পোস্ট। সচলায়তন এবং আমার নিজস্ব জার্নালের জন্যে লেখা।
-------------

০.
জাপান।

১.
সরকারে কে এলো আর গেলো - এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারো এই দেশটায়। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে - এমন খবরে আগ্রহ নেই রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পর্কহীন কেউ ছাড়া, তরুণ বা বৃদ্ধ বয়েসী কারও।
তারপরো নির্বাচন আসে, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া জনপ্রিয়তা যাচাই, কিংবা রাজনীতি বিষয়ক প্রলাপ নিয়ে সাজিয়ে তোলে খবরের অনুষ্ঠানগুলোকে। (মিডিয়াকেও খেয়ে-পড়ে বাঁচতে হবে তো, নাকি?)

আগামী জুলাই ২৯-এ উর্ধ্বকক্ষের নির্বাচনকে সামনে রেখে, জিজি প্রেস এর করা এক সমীক্ষা বলছে, প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে র প্রতি জনমানুষের সমর্থন নেমে এসেছে চার ভাগের এক ভাগে। ইওমিউরি শিম্বুন এর করা জরীপও অনেকটা এমন কথাই বলছে - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকা রক্ষণশীল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) র জন্যে মানুষের সমর্থন নড়বড়ে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির থেকেও কমে গেছে।

এইসব সমর্থন কমাকমিতে শিনজো আবের চেয়ার নিয়ে কোন সমস্যা নেই আপাতত, কারণ সামনের নির্বাচনটা উর্ধ্বকক্ষের। জাপানের ডায়েট এর গঠনটা এমন,সরকারে বসতে নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হয় আর আইন পাস কিংবা বড় কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে উর্ধ্বকক্ষে । গঠনটা অনেকটা টিপিক্যাল অবশ্য।
কাজেই, উর্ধ্বকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও আপাতত চেয়ার নিয়ে টানাটানির আশংকা কম, কিন্ত,সরকার চালাতে বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারে - সেই আশংকাটা জোরেসোরেই আছে। সেইখানেই এলডিপির ভয়।

২.
শিনজো আবে কোন নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেননি, তিনি এসেছিলেন তার পূর্বসুরি জুনিচিরো কোইজুমি গত অক্টোবরে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে অবসর নেবার পর। মি. আবে নারী ভোটারদের মাঝে সমর্থন পাবার জন্যে যথেষ্ট সুদর্শন, রাজনীতির সাথে তিন-চার প্রজন্ম জড়িত এমন পরিবারে সোনার চামচ মুখে জন্ম , পিতা ছিলেন বিদেশমন্ত্রী আর মাতামহ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ মাথায় নিয়েও পরবর্তীসময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন অনেকটা সময়।

শিনজো আবে, আপাদমস্তক সুযোগবাদী ও ধনিকশ্রেণীর প্রতিনিধি আর মনেপ্রাণে লালন করেন কট্টর "জাতীয়তাবাদী মৌলবাদ"
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভুলগুলোর (যুদ্ধাপরাধীদের বীর মনে করা কিংবা সেবাদাসী হিসেবে দশ মিলিয়নের মতো চীন-কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মেয়েদের অপমান) ব্যাপারে ক্ষমা চাইতে অনীহা দেখানোর যে মৌলবাদী নীতি - তিনি সেটাই ধারণ করেন।
সে যাক,ইতিহাস নিয়ে দুঃখ ছাড়া আর বলার কিছু নেই।

প্রধানমন্ত্রী আবে র শুরুটা হয়েছিল মধুচন্দ্রিমার মতো, গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেবার পর।
সস্ত্রীক বেইজিং আর সউল চীন সফরের মধ্য দিয়ে শুরু, তিক্ত সম্পর্কে কিছু মিষ্টতা আসবে - প্রত্যাশা ছিলো সবার । সে আশার গুড়ে বালি দিয়ে, ফলাফল ছিল শূন্য আর পুরো ব্যাপারটা ছিল আইওয়াশ।
তারপর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তার সরকারের ব্যর্থতার লিস্টিটা লম্বাই হয়েছে শুধু। দুর্নীতি আর অর্থের ব্যবহারে অস্বচ্ছতার কারণে একের পর এক মন্ত্রী/দপ্তরপ্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, কৃষিমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত সম্মান বাঁচাতে আত্মহননে মুক্তি খুঁজেছেন ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মেয়েরা সন্তান জন্মদানের যন্ত্র , প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলা ছাড়া যুদ্ধ শেষের উপায় ছিলনা - এরকম একেরপর এক বেফাঁস বক্তব্য ও তার পরবর্তী ফলাফল প্রধানমন্ত্রী আবের দায়িত্বকে করে তুলেছে কঠিনতর।

এইসব পরিস্থিতিতেই জনপ্রিয়তার এই নিম্নমুখিতা।

৩.
আগামী জুলাই ২৯শেই উর্ধ্বকক্ষের নির্বাচন হবে।
দেখা যাবে, সব সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে, প্রধানমন্ত্রী আবে র নেতৃত্বাধীন এলডিপি অন্য সময়ের মতো মোটামুটি ভালোভাবেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হবেন।
কারণ, ভোট দেবে বড়োজোর ২০ শতাংশ জনমানুষ, বয়স অনুযায়ী খুঁজলে দেখা যাবে তরুণ বা মধ্যবয়েসী প্রজন্মের উপস্থিতি শূন্যের কাছাকাছি।
ধনী-গরীব বৈষম্যের প্রকট আকার ধারণ কিংবা বার্ধক্যসময়কালীন ইন্স্যরেন্সের যে সরকার পরিচালিত ব্যবস্থা সেটার লেজেগোবড়ে আকার নেয়া - কতো সমস্যার মাঝেও পরিবর্তন চাইবেনা কেউ ।কারণ, সামনে অপশন নেই কোন।
যাকেই ভোট দেয়া হোক না কেনো, সেই একই গল্প তৈরি হবে।

সেই সরকারি অর্থের অপব্যবহার, সেই বার্ধক্য ইন্স্যুরেন্স নিয়ে লেজেগোবড়ে করে ফেলা ।
দেশটা টিকে থাকবে সাধারণ মানুষের চেষ্টা আর শ্রমের উপর। সরকারে কে আছে, সেটা চিন্তা না করেই কাজ করে যাবে জনমানুষ।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, কোন কর্পোরেট সংস্থা - যারা ট্যাক্স এর বিনিময়ে সার্ভিস দেবে - তাদেরকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়।

এইসব নির্বাচন-নির্বাচন খেলা আর অর্থহীন গণতন্ত্রের আসলেই দরকার আছে?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কথাটা ভেবে দেখা দরকার - অবশ্য,নিজস্ব অবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে।

----------
তথ্যসূত্র: ইওমিউরি শিম্বুন, টিভি নেটওয়ার্ক টিবিএস এর নিউজ২৩, বিবিসি
ছবিসূত্র: নাসা, নাসা কপিরাইট পলিসি , কৃতজ্ঞতা : উইকিপিডিয়া

মঙ্গলবার, জুলাই ২৪, ২০০৭

ধার করা চিত্রমালা - বিবিসি থেকে

বাংলাদেশে সামরিক শাসন - কী ভাবছেন সাধারণ মানুষ - বিবিসি থেকে।
(নিচের "পুরো পোস্ট পড়ুন" লিংকে গুঁতো দিন)


রবিবার, জুলাই ২২, ২০০৭

নিঃশব্দ দিন যায়

কী করবো ভেবে পাচ্ছি না।
জীবনের অনেকটা সময় ধরে নিজেকে সাহস দিয়েছি, ওই একটা কথা বলে -টাইম ইজ এ্যা গ্রেট হিলার
এখন আর সে অবস্থাও নেই।
সময় গেলে দুঃখগুলোর হাত-পা গজাবে, তারপর আমাকে ঘিরে ফেলবে - জানি ।

সকাল থেকে শুয়ে আছি, মানে, রাত থেকে - একবার ঘুম ভেঙেছে ১১টায় - হোম ডেলিভারি সার্ভিস এর ধাক্কায়, বাজারের প্যাকেটটা যেমন এসেছে তেমনিই আছে।
আবার শুয়েছি, এখন উঠলাম - বুঝতে পারছি, পাঁচটা বাজছে - ঘড়ি দেখে নয়, প্রতিদিন বেজে যাওয়া বিকাল পাঁচটা বাজার বাদ্য শুনে।
পেটে দানাপানি কিছু পড়ে নি ।

টু-থাউজেন্ড ওয়ান - এ স্পেস ওডিসি র শেষ দৃশ্যগুলোতে একা এক কক্ষে পায়চারি করতে করতে বুড়ো হয়ে যাওয়া বাউম্যান এর মতো মনে হতে থাকে নিজেকে এবং নিজের পার করা দিনগুলোকে।

নিঃশব্দ দিনের নীরবতা ভেঙে ফেলার সাহস পাই না।

---------
এই পোস্টগুলো কারো পড়া অর্থহীন - তাই আরএসএস ফিড বন্ধ করে রাখলাম।
কৃতজ্ঞতা জানাই এইখানে পা রাখার জন্যে।

বুধবার, জুলাই ১১, ২০০৭

"জিনা ইসি কা নাম হ্যায়"

সারাদিনে তিনঘন্টার একটা লম্বা সেমিনারের পর, নিজের ডেস্কে বসে, সচলায়তনে কিছু খুনটুসি ও দুজর্নদের ভাষায় পিঠ চুলকানি মার্কা কমেন্ট করার পর, কিটক্যাট মুখে পুরে দিয়ে সহজ কিছু সমীকরণ সমাধানে যখন ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফেরার জন্যে বেরুলাম, তখন বাইরে ঝুম বৃষ্টি, ঘড়ির কাটা পেরিয়ে গেছে ১১টার ঘর। ঘড়ির কাটা অবশ্য কোন অজুহাত নয়, ইচ্ছে করেই দেরি করা। সময় কাটানো জনভীড়ের মাঝে। সন্ধ্যায় অবশ্য পেটপুর্তির জন্যে দ্বারস্থ হয়েছিলাম অসময়ের খাদ্য-ভরসা ও খেতা পুড়ানো বিশ্বায়নের প্রতীক ম্যাকডোনাল্ডসে, কাগজের ঠোঙাটা বগলদাবা করে ডেস্কে ফিরে দেখি, মোটামুটি সুন্দরী ম্যাক-তরুণী আইস খাওয়ার চামচ দিয়ে আমাকে সালাদ খেতে বলেছেন। আমি তথাস্তু বলে তাই করি, কারণ সুন্দরীগণ যা করবেন, তাই সিদ্ধ।

দিনশেষে গবেষণার পূর্ব পুরুষদের উদ্ধার করতে যখন ইচ্ছে করে, যখন ভাবি, পিথিমীটা কী মজার, যে যেটা বোঝেনা, তাকে সেইটা করতে বসিয়ে দেয়া হয়। বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়ে বাড়ি ফেরায়, প্রায় খিদে নিয়ে একটা রুটি জাতীয় বস্তু চিবুতে চিবুতে সামান্য শরীর নড়াচড়া করার চেষ্টার পর একটা দিন যখন শেষ হয়, তখন বাসায় ঢোকার মুখে সারাদিনে বেশ কয়েক বার শোনা ওই গানটাই মাথায় ঘুরপাক করতেই থাকে।

জীনা ইসি কা নাম হ্যায়।

-------------------------------
মুল গান: কিসি কি মুসকুরা হাটো পে হো নিসার
ছবি : আনাড়ি ১৯৫৯, মূল ভূমিকায়: রাজকাপুর
কণ্ঠ : মুকেশ
গান ইউটিউব এর এই লিংক থেকে অডিও ট্র্যাক আকারে পরিবর্তিত

বৃহস্পতিবার, জুলাই ০৫, ২০০৭

ঘুম ভেঙে গেছে মাঝপ্রহরে

খুব ছোটবেলায় কোন এক রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, একা বাড়িতে নিজেকে আবিষ্কার করি, - সম্ভবত মামার বিয়েতে নানাবাড়িতে চলে গিয়েছিলো বাড়িশুদ্ধ সব মানুষ। নানাবাড়িটা ছিলো বাড়ির সামনে ভিটেজমিগুলোর ওপারে। আমি তখন চার কিংবা তিন ।

চমকে উঠেছিলাম সে রাতে, সেই বোধটা মস্তিষ্কের কোন নিউরনসমষ্টি এখনো ধরে রেখেছে তাদের বুকে। কেনো; জানা নেই । জানতে ইচ্ছে করে এইসব জীবনরহস্য কখনো-সখনো অবশ্য।

পলাশী আর বকশীবাজার এর মাঝে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি আছে সেটিতে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো ছয় মাস, সেই সূত্রে হল যাপন করেছিলাম আটমাস মতোন।
আহসানউল্লাহ পশ্চিম ২৩৪।
থাকতাম একা একটা রুমে - তিনজনের রুমে একা - ছাত্রফ্রন্ট এর তারেক ভাই থাকতেন নিজের বাসায় আর অন্য একটা সিট কেমন যেন অবরাদ্দ গোছের। সেই রুমটায় আমি আসার বছর সাতেক আগে কে একজন বেছে নিয়েছিলো আত্মহনন - সেই মানুষটার ছেড়ে যাওয়া একটা ঘড়িও টিকটিক করতো অনেকদিন। তারেক ভাই মজা করে বলতেন, ব্যাটারি নাকি উনি কখনো বদলাননি , অশরীরী শক্তি দিয়ে চলে ঘড়িটা।

মাঝরাত্তিরে জেগে উঠতাম, বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কালো চাদর টা গাঁয়ে জড়িয়ে হাঁটাহাঁটি করতাম অনেকক্ষণ । ভয় পাইনি কখনো - অশরীরী অথবা শরীরী কোন কিছুর।

দেশ ছাড়ার পর এক বছর অনেকগুলো ভিন্নসংস্কৃতির মানুষের সাথে থাকতাম, মাঝরাত্তিরে উঠলে মাতালদের মজার সব কান্ড দেখতে হতো। নিজে ওই পানীয়-সম্পর্কিত বেড়াটা ভাঙতে পারিনি কখনো, তাই মজা দেখতাম।

এখনো মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে যায়, পেপারওয়ালা ছোকরাটা তার মোটরবাইক হাকিয়ে যখন গলি ছেড়ে যায় - বাইকের লাইসেন্স থাকলে আমিও যে পার্টটাইম টা করবো, অনেকদিন ভেবেছিলাম। গা ঘেমে ওঠে, আর ঘুমুতে পারিনা ।
এক সুহৃদ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ইনসোমনিয়ায় ভুগতো - তাকে যে পরামর্শগুলো দিয়েছিলাম, সেগুলো নিজেই চেষ্টা করে দেখি।
কাজ হয়না অবশ্য।
রাগ হয় নিজের উপর।

দ্বিচক্রযান নিয়ে বেরিয়ে পড়ি মাঝরাতে।
ওই গানটা সুর ধরি, যেটা মাঝেমধ্যেই মনে আসে - হরি, দিনতো গেলো, সন্ধ্যে হলো, পার করো আমারে।


------
ছবি ব্যবহার, ক্রিয়েটিভ কমন্স এর আওতায় ফ্লিকার থেকে, কৃতজ্ঞতা

বুধবার, জুলাই ০৪, ২০০৭

ডিসক্লেইমার : অলেখকের ক্ষমা প্রার্থনা

প্রথমেই বলে রাখি, আমি লেখক নই।
লেখালেখি বলতে যা বোঝায়, আমার মধ্যে কোনকালেই ছিল না। কোনদিন কোন লিখিয়েদের আড্ডায় যাওয়া হয় নি, না, সুযোগই হয়নি আসলে।

আমি যা লিখি, তা লেখা না বলে কিছু খসড়া বলা ভালো। কিংবা প্রলাপ অথবা এলেবেলে - আবজাব বাক্য রচনা। নিজেই লিখি, নিজেই পড়ি - পাগলের সুখ মনে মনে - আর কি!

আজকাল যোগ দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে এখানে, মানে মানে সচলায়তন-এ ।
ক্ষমা প্রার্থনা করবো - আমার কাছে কেউ লেখা প্রত্যাশা করবেন না। সচলায়তন এর জন্ম হলো - কিছুই দেবার ছিল না এই শুভক্ষণে। সবার লেখাও ঠিকমতো পড়া হয়নি।

আমি এমনিতেই বেশ অপরাধবোধে ভুগি খুব তুচ্ছ ব্যাপারে, অপরাধবোধ এর লিস্টিতে আরেকটা এন্ট্রি বেড়েছে।
তাই ক্ষমা প্রার্থনা করি।

---------
সচলায়তনে প্রকাশিত ডিসক্লেইমার থেকে

মঙ্গলবার, জুন ২৬, ২০০৭

হৃদয়ে মৃত্যু আসে যখন ..

আজকাল মৃত্যু এসে ভীড় করে মনে। মনে হয়, অনেক তো হলো।
ভাবি - তবে কি বুড়িয়ে গেলাম?
কুড়িতেই যক্ষা নিয়ে যায় সুকান্তকে। আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলা রুদ্রকবিও চলে যান অল্প সময়ে।
এইসব মৃত্যুদের মনে হলে অবশ্য সময়টা চলে যাওয়ার জন্যে "অ-কাল" মনে হয় না।

শৈশব এসে ভীড় করে পুরো হৃদয় জুড়ে, স্মৃতিরা একেকটা অদ্ভূতুড়ে প্রাণযুক্ত হয়ে ওঠে - উপহাস করে - আবার কোনটা মায়া জড়িয়ে মাদকের আবেশ রেখে চলে যায়। আমি পড়ে থাকি একা ।
এইখানে।
নিধুয়া এই পাথারে।

সবকিছু ছবি হয়ে আসে।
চৈত্রের খনখনে রোদে আমি দৌড়ুতে গিয়ে উল্টে পড়ে যাই ধুলো হয়ে যাওয়া লাঙল দেয়া জমিটায়, মায়ের লাঠির ভয়ে অনেক কষ্টে থুথু দিয়ে ধুলো মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করি।


ক্লাস থ্রিতে আমি কথা বলায় ম্যাডাম আমাকে নিল ডাউন করিয়ে রাখে, পাশে বসা রুপম বলে, ও দাড়িয়ে থাকলে আমিও থাকবো, কারণ আমি ওর সাথে কথা বলতেছিলাম। ম্যাডামের অবাক চেহারা এখনো মনে পড়ে।
সেই স্কুলটা আমি পরের বছর ছেড়ে দিই।
রুপম ডাক্তার হয়ে গেছে বোধহয়। শেষ দেখা হয়েছিলো ও সলিমুল্লাহ তে ভর্তি হওয়ার পর।
রুপম, কই আছিসরে এখন?

ধুর, এইসব কেন যে মনে পড়ে?
বুড়োত্বের খুব বড়সড় সিমটম।

একা ভাবতে বসি, পেরিয়ে যায় সময়। মনে মনে অনেকদূর চলে যাই - ফিরতে পারি না আর, কোথা থেকে শুরু করেছিলাম।
হয়ে যাই ফটিক কিংবা অপু অথবা অনিমেষ। মফুস্বলে আমি এই ধনবাদী নগরের কংক্রিটের বেড়াজালে খুঁজে ফিরি আশ্রয় শূন্যতার কাছে।
ভাবনা ঘিরে ধরে ক্লান্ত-শ্রান্ত আমায় , এই পথের ক্লান্তি থেকে জিরিয়ে নেবার সুযোগও পাই না আজকাল- দেশ-কাল-পাত্র কোন কিছু না ভেবেই যে পথটা এতোদূর এলাম।
দেশ-কাল-পাত্রের অক্ষ অবশ্য ভাবনার পটে গৌণ - সব সমান্তরাল - মাঝেমধ্যে কিছুকিছু এবড়োথেবড়ো বাদ দিলে।

ভাবি, অনেকদূরই তো হাঁটলাম এই স্বল্প সামর্থ্যের দুর্বল আমিত্ব নিয়ে।
ঠিকঠাক বেঁচে থাকলে আর কদিন পর হয়তো বৈশ্যিক দাসত্ব করবার জন্যে নষ্ট কর্পোরেটদের দরজায় দাড়িয়ে পড়বো, একগাদা মিথ্যে প্রতিদিন অবলীলায় বানিয়ে বলে যাবো কলচাবি দেয়া পুতুলের মতো। নিজেকে সর্বোত্তম দাস হওয়ার জন্যে যোগ্যতম হিসেবে হাজির করবো স্যারদের দরবারে দন্তপাটি বিস্তৃত হাসি উপহার দিয়ে।
তারপর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পা চাটতেই থাকবো প্রভূদের। জানি, সে-ই জীবন অপেক্ষা করে থাকে - এই পথের শেষে।

---------------------------------------------------

এই প্রতিবেশে অস্ত্র নেই, কোন উদভ্রান্তের এলোপাথাড়ি গুলিতে অকালে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা মিলিয়নে এক এরও কম।
এই শহরে ট্রাম নেই, ভয় নেই জীবনানন্দ হওয়ার। বাতাসে সীসা নেই, পানিতে নেই অতিমাত্রার খনিজবিষ।
এই শহর এবং শাহরিক মানুষগুলো অ-কালে মরে না। তারা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে, অন্যদের সমস্যা করে অথবা না করেই। তারা আমাদের তথাকথিত বুড়োত্বের বয়সে পৌঁছেও নির্জীব হয় না, দিব্যি বেঁচে থাকে - শারীরিক ও মানসিক ভাবে। জগতকর্মে কোন বাধা পড়ে না; প্রেম করে, করে পরকীয়াও।

তবুও এইসব কিছুর মাঝে থেকেও আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে।

শরীরযন্ত্রের যে মৃত্যু , তা আমাকে কোন ভীতিবোধে আচ্ছন্ন করে না । ঈশ্বরে আমার অবিশ্বাস নেই - কিন্তু ব্যাপারটা অনেকটা - ঝাল খাবারে আমার অরুচি নেই - ধরনের বিষয়ের মতো সহজ। প্রার্থনা অথবা ঈশ্বর-উপাসনা - মাঝেমধ্যে সামান্য করি না - তাও নয়। খুব খারাপভাবে বললে - কিঞ্চিত ভণ্ড - বিশ্বাসে।

তাই শরীরযন্ত্রের মৃত্যু নামক পৃথিবীর জটিল অনন্য ব্যাপার-স্যাপারটি আমাকে সামান্যতম শুদ্ধ বা ভীত হতে শেখায় না।
"আছি" বা "থাকি" ব্যাপারগুলো তৃতীয় পক্ষের চোখে "ছিলো" বা "থাকতো" হয়ে যাওয়াটা আর এমন কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশুনা করছে এরকম কাছাকাছি একজন প্রথম কোন ডেথ সার্টিফিকেট লিখে বেশ উত্তেজনা প্রকাশ করেছিল আমার কাছে, আমি অবাক হয়েছিলাম। সময়ের প্রবাহে নাকি খুব একটা কিছু বোধ হয় না।

তবে মন নামক আপাত-আপেক্ষিক বস্তুটির নিঃশেষ হয়ে যাওয়া আমাকে ভীত করে তোলে।
বুড়োত্বের ভয় আমার সেইখানেই।
অজরামর কোন প্রাণের প্রত্যাশা আমি করি না। জরাকে আমি জীবনের সঙ্গী বলেই বোধ করি।
মৃত্যু আমার কাছে রোমান্টিক কোন ধারণা নয়, হয়তো নতুন কোন পথ খুলে আছে শ্যামসম মরণ এর ওপারে।
তবুও অপ্রিয় সে।
বড্ড অপ্রিয়। দাসের হেঁটে চলা জীবনেও সে অনাকাঙ্খিত।

----
জুন ২৬, ২০০৭।
একই সাথে সচলায়তনে প্রকাশিত।
----
সচলায়তন : চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির

মঙ্গলবার, জুন ১৯, ২০০৭

এইসব দিনরাত্রি - ৩

আগে মনে করতাম, শুধু আমিই অভিনয়ে পটু। ২৪ ঘন্টা অথবা ১৪০০রও বেশি মিনিট আগে সে ধারণায় ভুল ভাঙলো। আমার গবেষণাসন্দর্ভ বিষয়ক ব্যাপার-স্যাপার এর জন্যে যে গবেষণাকক্ষটিতে আমি সংযুক্ত, তার মধ্যম কর্তাটি যখন গবেষণাকর্মের সাথে জড়িত সবার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছেন এক মহান বক্তৃতার মাধ্যমে, তখন মুঠোফোন টি হঠাৎ বেজে ওঠে এবং আমাকে যোগাযোগ দেয়া হয় কেন্দ্রীয় মুঠোফোন কক্ষে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে আমি কাকলি কন্ঠে কারও রেখে দেয়া মেসেজ শুনতে পাই এবং বুঝতে পারি, কিছু একটা বড়সড় ঝামেলা ইজ কুকিং।

তারপর ১৮০ মিনিট কেন্দ্রীয় প্রসেসিং ইউনিটে তথ্য ইনপুট করার পর ঝামেলার বিষয়বস্তু আমি বুঝতে পারি ।
আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি এবং বুঝতে পারি, চারপাশের সবাই খুব পাকা অভিনয়-শিল্পী।

শুভাকাঙ্খীদের জন্যে বার্তা রইলো যে, আমি আপাতত নিজের আসল অস্তিত্বেই এবং আসল ঠিকানাতেই আছি।
এবং আমি অর্থোডক্স হলেও প্রাচীনপন্থী নই আর, আবেগতাড়িত হলেও যুক্তিহীন, অন্ধ নই।


--------------
ডিসক্লেইমার:
"এইসব দিনরাত্রি" র ব্যাপারস্যাপার গুলো জাস্ট কিছু দৈনন্দিন খসড়া ,ইচ্ছে করেই দুর্বোধ্য করে তোলা।
খুব একটা মনোযোগ দিয়ে না পড়ার অনুরোধ করি। মাথা ব্যথা ধরার সম্ভাবনা খুব বেশি।

রবিবার, জুন ১৭, ২০০৭

ফিরতেই তো চাই, বাবা!

সরীসৃপ আমি অপছন্দ করি। ছোটবেলার একটা স্মৃতি এখনো আমাকে ভয়ানুভূতিতে আন্দোলিত করে ।

আমি আমাদের লিচু গাছটার নীচে একটা জলচৌকিতে শুয়ে আছি, পাশে তিনি।
একটা সাপ উপর থেকে আমাদের জলচৌকিতে প্রায় আমার গায়ে এসে পড়ে, কিছুক্ষণ পর তাঁর কোলে নিজেকে আবিষ্কার করি।
সাপটাকে পরে মারা হয়।

তিন-চার বছর বয়সের স্মৃতি কারও মনে থাকে?
কেন যেন আমার মনে আছে।
সেবার আমার ঘাঁড় শক্ত হয়ে যাওয়ার অসুখ হয়েছিল। তিন অথবা চার তখন। বাড়িতে মামা সম্পর্কীয় একজন বড় ভাই-বোনদের পড়াতেন, তাঁর কাছে আমিও বসে যেতাম পড়তে।
অক্ষরজ্ঞান রপ্ত হয়নি তখনো।

বাচ্চার মেনিনজাইটিস - ডাক্তার বলে। তিনি চাকুরিতে লম্বা ছুটি নিয়ে আমাকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন লিচু গাছটার নীচে।
একগাদা ইনজেকশন, সন্ধ্যাবেলায় দিতে আসতো এক ডাক্তার।

সন্ধ্যাবেলা, অন্ধকারটা যখন একটু জড়িয়ে আসে, লিচু গাছটার ওপাশে খড়ের গাদাগুলোকে আবছা অন্ধকারে ভৌতিক কোন মূর্তির মতো মনে হয়, কুকুরে কামড়ে দেয়া আম গাছটার ওপারের ধুলো ওড়ানো রাস্তাটা ধরে হাটে যাওয়া মানুষগুলো ফিরতে শুরু করে যখন - সেই সময়ে।
বাবার কোলে বসে আমি, ধমনী খুঁজে না পেয়ে ডাক্তার ব্যাটা নাকানি-চুবানি খায়।

লিচু গাছটা এখনো আছে, চাঁপা গাছটার পাশে, গোরস্থানের ঠিক সামনে।
সেই গাছটা দেখলে আমি এখনো ভয় পাই। সরীসৃপের স্মৃতি মনে পড়ে আমার।

মেনিনজাইটিস সেরে যাওয়ার এক বছর পরে আমরা গ্রাম ছাড়ি, শহরে আসি জনকের চাকুরি সূত্রে।
শহর বললেও সে এক মফস্বল - করতোয়া নদী আর একটা ছোট ব্রীজ, চিরে ফেলেছে মফস্বল শহরটাকে - জনকের আঙুল ধরে ছোট সৌরভ হাঁটে, শীতে জনকের কোলে চড়ে হিমালয় দেখার চেষ্টা করে।
দুপুরে বাড়িতে খেতে আসা গুরুগম্ভীর বাবার পাশে গুটিসুটি মেরে অপ্রিয় দুপুরি-ঘুম দিয়ে দেয় এক প্রস্থ। বাবাটা যেন কেমন, বাইরে কতো মজা, দুপুরে না ঘুমুলেই হয়না?

-----------------------

তারপরের গল্প যেরকম হয়, সেরকমই।
আমি, সৌরভ বড় হয়ে যাই অন্য সবার মতো। জীবনের প্রয়োজনে বাড়ি ছাড়ি, মফস্বল ছাড়ি, শেষ পর্যন্ত দেশও ছেড়ে দিতে হয়।
বছরে এক-আধবার যাই বাড়িতে।

প্রতিবছরই বাবাকে দেখি - অনুভব করি - বুড়ো হয়ে গেছেন আগের বারের থেকে আরেকটু ।
গুরুগম্ভীর বাবা, যাকে আমার বন্ধুরাও ভীষণ ভয় পেতো, আমরা ভাই-বোনেরা পড়াশুনো না করে টিভি দেখতাম বলে যিনি এক আছড়ে ভেঙে ফেলেছিলেন যন্ত্রবাক্সটা - নিজের জন্যে অনুভব করি তাঁর আকুলতা ।
ফোনে শুনি - কবে আসবি?
রেগেমেগে উল্টোপাল্টা বলি - সামারে ইন্টার্ন করবো, হ্যান করবো - সময় নাই আসার
এপারে বৃষ্টি ঢাকি, "বাবা, আসতে তো চাই সবসময় - কতো শেকল" ।

বাবা, জানো, আমি এখনো সরীসৃপের স্বপ্ন দেখি, ঘেমে উঠে ঘর ঠান্ডা করতে সুইচ টিপি।
পঞ্চগড়ে আমরা যখন থাকতাম, তখন প্রচন্ড ভূমিকম্পে কোন এক ভোরে তুমি পাঁচ-ছয়বছরের একটা ভারী বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরে ছুটে গিয়েছিলে, মনে পড়ে, বাবা?
আমার মনে পড়ে।
এখন যে মাঝেমধ্যেই ভূমিকম্প হয় মাঝরাতে।

বহুদিন ইচ্ছে করে, জিজ্ঞেস করি - পিতঃ, এই অক্ষম সন্তানকে নিয়ে কোন স্বপ্ন করেছিলে কি রচন?
করা হয়না, করতে পারিনা।
বাবার সাথে দূরত্ব অনেক এখন।
কয়েক হাজার কিলোমিটার অথবা কয়েকটা দেয়াল।

দূরত্ব অথবা সে দেয়াল অতিক্রমের সাধ্য আমার নেই।

জুন ১৭, ২০০৭
-----
ছবিটা প্রাসঙ্গিক, সেই লিচু গাছটা ছবিতেই আছে

শনিবার, জুন ১৬, ২০০৭

তাঁদের মুখচ্ছবি

এই লিংকটা কেন যে বুকমার্ক করেছিলাম, জানি না।

ছবিগুলো সাদা-কালো, খুবই প্রফেশনাল হাতে তোলা অবশ্যই। আলো-আধাঁরির সমন্বয়ের অভাব অনুভূত হবার কোন সুযোগ নেই।
অল্প কিছু মুখ, অনেকগুলো মুখের প্রতিনিধি।

কোনটাতে ফটোগ্রাফার এর ইচ্ছাকৃত শৈল্পিক অস্পষ্টতা, চোখের দৃষ্টি কারও অনেকদূরে - জীবনযুদ্ধটা জিততে পারেননি অনেকে - সেই বোধও স্পষ্ট।
একজন শ্মশ্রুমণ্ডিত, দুহাত তুলে অপার প্রার্থনা স্রষ্টার প্রতি । পাশেই আরেকজন ধূমপান করছেন। অদ্ভূত সহবাস

অনেক গল্প।
আমাদের জন্মের সাথে জড়িত।
আমাদের এবং ৩৬ এর তরুণ এই ভূ-খন্ডের।

১৯৯৮র ডিসেম্বর উনিশে চলে যাওয়া আবুল হোসেইন র হাস্যোজ্জ্বল চেহারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় - যে আবেগ দিয়ে তিনি চিৎকার দিয়েছিলেন "জয় বাঙলা", তার জন্যে তিনি কোনদিন অনুতাপবোধ করেননি।
চশমার ভিতর থেকে আবু সুফিয়ান এর যে দৃষ্টি, তাতে অবশ্য নিজেদের হাতে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রের পচনে তাঁর হতাশাই আমি অনুভব করি।
কিংবা নিজেকে হারিয়ে ফেলা খালেদ - যাঁকে ২৫শে মার্চের রাতে গান গাওয়ার অপরাধে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাঁর দৃষ্টি ক্যামেরা ছাড়িয়ে ধরা থাকে অন্য কোথাও। স্থিরচিত্রে শব্দ থাকেনা, কিন্তু আমার কানে তাঁর গান বাজতে থাকে।
ধীরেন্দ্র কুমার দেব রেন্টগেন ছবি দেখাতে থাকেন। তাঁর তীব্র দৃষ্টির কাছে আমি ক্ষুদ্র হয়ে যেতে থাকি।

আমি এই ছবিগুলো বারবার দেখি, সহ্য করতে পারি না, তারপরও।
কেনো, বলতে পারবোনা।

আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের এক যুগ পরে, আমার সহোদরদের সবার জন্ম একাত্তুর বা তার পরে।
আমার বাবা সত্যিকার অর্থে মুক্তিযোদ্ধা নন, শুনেছিলাম - শেষ সময়ে ট্রেনিং নিতে গিয়েছিলেন, সম্মূখযুদ্ধে অংশ নেননি। আমার পরিবারে নেই কোন যুদ্ধের ক্ষত। তবু্ও আমার নার্ভ এই ছবিগুলো মেনে নিতে পারেনা।
আমার লজ্জ্বা হতে থাকে।

আচ্ছা, যুদ্ধটা যদি এই মূহুর্তে হতো, আমি অথবা আমরা কি গাইতাম "মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি" ।
যে হাতে আমরা ধরি প্রিয়জনের নরম হাত, সেই নীরিহ-রুক্ষ হাতে তুলে নিতাম কি কোন অস্ত্র?
অথবা, একাত্তুরে এই আমিই যদি হতাম ২৪-২৫ এর তরুণ, তাহলে?

আবু সুফিয়ান বা ধীরেন্দ্র কুমার দেব দের আবেগ বা ভালোবাসার কাছে নিজেকে পিঁপড়াসম তুচ্ছ মনে হতে থাকে।


-----------------------------------
সবগুলো ছবির লিংক: দৃক গ্যালারি

দৃক গ্যালারির আবীর আবদুল্লাহ এই ছবিগুলো তুলেছিলেন,
কলেজগেট মোহম্মদপুরের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগার থেকে, ১৯৯৭ তে।
ছবি কপিরাইট : আবীর আবদুল্লাহ।

শনিবার, জুন ০৯, ২০০৭

ঘরে ফেরার গান

ওপারে মেঘলা পৃথিবী, এপারে বিক্ষিপ্ত মন আর ক্লান্ত দেহ।
যান্ত্রিক শবের সাথে মাখামাখি।
মুঠোফোনের চিৎকারে যে দিনের শুরু হয়, তার শেষ বলে কিছু থাকেনা। পুরোটাই প্রবাহের মতো।
শুরুটা-শেষটা বোঝার উপায় নেই ।
ছুটতে ছুটতে হারিয়ে ফেলি নিজের শেকড়।

মাঝে মাঝে ভাবতে বসি আকাশ-পাতাল, ছাইপাশ। পুরো জগতটাই হয়ে ওঠে আমার ভাবনা-ঘর।
নিজেরেই শুধাই,
"আমার আমি, আর কতো?"
উত্তর পাই না ।
আসলে, উত্তর থাকেনা এসবের।

"উত্তর থাকতে হয় না" - বেশি বেশি সত্যবান হলে এমনটাই বলা উচিত।
তবুউউউ.. ঘরে ফিরতে মন চায়।
ঘরে।

---------------
ঘরে ফেরার গান, মহিনের ঘোড়াগুলি
গানের কথা - (কৃতজ্ঞতা :: হযু দা )